পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবেন রোনালদো

বাংলা রিডার ডেস্ক
পর্তুগালের জার্সিতে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর উপস্থিতি মানেই ছিল অন্যরকম এক আবেগ, উন্মাদনা ও প্রত্যাশা। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে কোটি ভক্তের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই মহাতারকা এবার আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর পথে। জাতীয় দলের হয়ে অসংখ্য স্মরণীয় অর্জন ও রেকর্ড গড়ে পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম চিরস্থায়ী করে রেখেছেন তিনি।
রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়া ক্যারিয়ারের শেষটা অবশ্য সুখকর হলো না। কোচের সঙ্গে বিরোধ আর জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার বিতর্কের মধ্যেই ইতি টানলেন বর্ণাঢ্য এক অধ্যায়ের।
তবে পর্তুগালের ফুটবলে তিনি যা রেখে গেলেন, তা কেবল গোল কিংবা শিরোপার হিসাবে সীমাবদ্ধ নয়।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ এক ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন রোনালদো।
পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন ৪১ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ড। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ও গোল করার দুটি বিশ্বরেকর্ডই তার দখলে।
বিদায়বেলায় পর্তুগালের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা।
‘মাদেইরায় ছোট্ট একটি ছেলে হিসেবে বলের পেছনে ছুটতে ছুটতে যে স্বপ্নের শুরু হয়েছিল, সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দেওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।’
‘মাথা উঁচু করেই বিদায় নিচ্ছি। যে পথ পাড়ি দিয়েছি, তা নিয়ে আমি গর্বিত। জানি, পর্তুগালের জন্য আমার সবটুকুই দিয়েছি।’
রোনালদোর এই বিদায়কে ঘিরে অবশ্য আক্ষেপও রয়েছে। পর্তুগালের হয়ে শেষ ম্যাচটি যে তিনি খেলেছেন, তখন কেউ জানত না সেটিই হবে জাতীয় দলের জার্সিতে তার শেষ উপস্থিতি।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর নেশন্স লিগে ওয়েলসের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ের ম্যাচে সবশেষ পর্তুগালের হয়ে মাঠে নামেন তিনি।
এরপর নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তাকে পুরো সময় বেঞ্চে রাখেন কোচ হোর্হে জেসুস। পরের ম্যাচেও শুরুর একাদশে জায়গা না পাওয়ার ইঙ্গিত মেলায় জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যান রোনালদো।
এই ঘটনায় শাস্তির মুখেও পড়তে হয় তাকে। জাতীয় দলের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে জরিমানা ও নিষেধাজ্ঞা পান তিনি।
অবশ্য তখনই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়ার কথা বলেননি রোনালদো। বরং জাতীয় দলের হয়ে আবার খেলার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত আর মাঠে ফেরা হলো না তার।
এমন পরিণতির আভাস অবশ্য মিলেছিল অনেক আগেই।
২০২২ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে রোনালদোকে শুরুর একাদশের বাইরে রাখেন পর্তুগালের তৎকালীন কোচ ফের্নান্দো সান্তোস। তার জায়গায় সুযোগ পাওয়া গনসালো রামোস হ্যাটট্রিক করেন। ম্যাচটি ৬-১ গোলে জিতে নেয় পর্তুগাল।
এরপর থেকেই জাতীয় দলে রোনালদোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন বাড়তে থাকে। বয়সের সঙ্গে তার সামর্থ্য কমছে কি না, কিংবা শুধু অতীতের খ্যাতির কারণেই তিনি নিয়মিত সুযোগ পাচ্ছেন কি না—এসব নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে।
তবে সমালোচনার মধ্যেও গোল করা থামাননি রোনালদো। ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে পর্তুগালের হয়ে আরও ২৮ গোল করেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার প্রভাব বোঝার জন্য পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। তবে সংখ্যার বাইরেও রয়েছে অন্য এক গল্প।
প্রায় এক কোটি ১০ লাখ মানুষের দেশ পর্তুগাল। সেখানে জাতীয় দলের ম্যাচ মানেই রোনালদোকে ঘিরে বাড়তি উন্মাদনা। গ্যালারিতে অসংখ্য সমর্থকের জার্সিতে লেখা থাকে তার নাম ও সাত নম্বর। শিশুরা অনুকরণ করে তার বিখ্যাত গোল উদ্‌যাপন।
এই জনপ্রিয়তা শুধু নিজের দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে রোনালদোর অসংখ্য ভক্ত।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উজবেকিস্তানের কথাও। দেশটির সঙ্গে রোনালদোর সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও সেখানে তার জনপ্রিয়তা বিপুল।
এবারের বিশ্বকাপে উজবেকিস্তান ও পর্তুগালের ম্যাচে নিজের দেশের বদলে রোনালদোকে সমর্থন করেছেন উজবেকিস্তানের কিছু ফুটবলপ্রেমীও।
দেশটির রাজধানী তাশখন্দের বাজারে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও ম্যানচেস্টার সিটির পাশাপাশি রোনালদোর ছবি দেওয়া ফুটবল সামগ্রী বিক্রি হতে দেখা গেছে।
রোনালদোর এমন জনপ্রিয়তার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তার নয় বছরের অবিশ্বাস্য সাফল্যের। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার অবদানও কম নয়।
পর্তুগাল আগে থেকেই ফুটবল ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ দেশ ছিল। ইউসেবিও, লুইস ফিগোদের মতো কিংবদন্তিরা খেলেছেন দেশটির হয়ে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে তৃতীয় হয়েছিল পর্তুগাল।
তবে রোনালদোর আগে কখনও বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা জিততে পারেনি তারা।
তার নেতৃত্বে সেই আক্ষেপ ঘোচে ২০১৬ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে নেশন্স লিগ জেতে পর্তুগাল।
অর্থাৎ মাত্র নয় বছরের মধ্যে তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের স্বাদ পায় দেশটি।
শুধু শিরোপা নয়, বড় প্রতিযোগিতাগুলোয় নিয়মিত জায়গা পাওয়ার ক্ষেত্রেও রোনালদোর সময়কালে বড় পরিবর্তন আসে পর্তুগালের ফুটবলে।
২০০৩ সালে তার অভিষেকের আগে ১৭টি বিশ্বকাপের মধ্যে মাত্র তিনটিতে খেলেছিল পর্তুগাল। রোনালদোর সময়ে টানা ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেয় তারা।
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও একই চিত্র। রোনালদোর আগে ১২টি আসরের মধ্যে তিনটিতে জায়গা পেয়েছিল পর্তুগাল। তার সময়ে টানা ছয় আসরে খেলে দেশটি।
অবশ্য এই সাফল্যের পেছনে শুধু রোনালদোর অবদান ছিল না। গত দুই দশকে পর্তুগালের ক্লাবগুলোর একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন অসংখ্য প্রতিভাবান ফুটবলার।
ব্রুনো ফের্নান্দেস, বের্নার্দো সিলভা, জোয়াও মৌতিনিয়ো, রুবেন দিয়াস ও জোয়াও নেভেসদের মতো ফুটবলাররা দেশটির ফুটবলকে এগিয়ে নিয়েছেন।
তবে এসব ফুটবলারের অনেকের কাছেই বেড়ে ওঠার সময় আদর্শ ছিলেন রোনালদো। একসময় যাকে দেখে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন, পরে তার সঙ্গেই জাতীয় দলের ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করেছেন তারা।
বড় ম্যাচে রোনালদোর একক নৈপুণ্যের উদাহরণও কম নয়।
২০১৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে গ্রুপে রাশিয়ার পেছনে থাকায় প্লে-অফ খেলতে হয়েছিল পর্তুগালকে। প্রতিপক্ষ ছিল জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের সুইডেন।
লিসবনে প্রথম লেগে রোনালদোর গোলে ১-০ ব্যবধানে জেতে পর্তুগাল। চার দিন পর স্টকহোমে ফিরতি লেগে হ্যাটট্রিক করেন তিনি।
প্রথম লেগে রোনালদোর গোলে ১-০ ব্যবধানে জেতে পর্তুগাল। চার দিন পর স্টকহোমে ফিরতি লেগে হ্যাটট্রিক করেন তিনি।
লিসবনে প্রথম লেগে রোনালদোর গোলে ১-০ ব্যবধানে জেতে পর্তুগাল। চার দিন পর স্টকহোমে ফিরতি লেগে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। ইব্রাহিমোভিচের জোড়া গোলের পরও ৩-২ ব্যবধানে জিতে দুই লেগ মিলিয়ে ৪-২ গোলের জয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে পর্তুগাল।
২০১৮ বিশ্বকাপেও স্মরণীয় এক হ্যাটট্রিক করেন রোনালদো। স্পেনের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে শেষ দিকে দুর্দান্ত এক ফ্রি কিকে গোল করে দলকে ৩-৩ সমতায় ফেরান তিনি।
পরের বছর নেশন্স লিগের সেমি-ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আবারও হ্যাটট্রিক করেন রোনালদো। তার নৈপুণ্যে ৩-১ গোলে জিতে ফাইনালে ওঠে পর্তুগাল। পরে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে শিরোপা জেতে তারা।
২০২৫ সালে ৪০ বছর বয়সেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে জ্বলে ওঠেন এই ফরোয়ার্ড। নেশন্স লিগের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে সমতাসূচক গোল করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে শেষ হওয়া ম্যাচে টাইব্রেকারে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা ঘরে তোলে পর্তুগাল।
তবে জাতীয় দলের জার্সিতে রোনালদোর সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় সম্ভবত ২০১৬ ইউরো।
গ্রুপ পর্বে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ৩-৩ গোলে ড্রয়ের ম্যাচে জোড়া গোল করার পাশাপাশি আরেকটি গোলে সহায়তা করেন তিনি। ওই পারফরম্যান্সেই প্রতিযোগিতা থেকে আগেভাগে বিদায়ের শঙ্কা কাটায় পর্তুগাল।
এরপর সেমি-ফাইনালে ওয়েলসের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক হেডে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন রোনালদো।
ফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সের বিপক্ষে অবশ্য বেশিক্ষণ মাঠে থাকতে পারেননি। চোট পেয়ে ২৫ মিনিটেই মাঠ ছাড়তে হয় তাকে।
চোখের জল নিয়ে মাঠ ছাড়লেও পরে টাচলাইনে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের উৎসাহ দিয়ে যান রোনালদো। কখনও কোচের পাশে দাঁড়িয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন, কখনও চিৎকার করে উজ্জীবিত করেছেন ফুটবলারদের।
শেষ পর্যন্ত এদেরের গোলে ফ্রান্সকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবার ইউরোপ সেরা হয় পর্তুগাল।
সেই অর্জনই রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
অথচ তার বেড়ে ওঠার গল্পটা ছিল একেবারেই অন্যরকম।
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের দ্বীপ মাদেইরায় সাধারণ এক পরিবারে জন্ম রোনালদোর। তিন ভাইবোনের সঙ্গে একটি ঘরে থাকতেন তিনি। বাড়িতে জায়গার এতটাই অভাব ছিল যে, কাপড় ধোয়ার যন্ত্র রাখতে হয়েছিল ছাদে।
মাত্র ১২ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে লিসবনে স্পোর্তিং সিপির একাডেমিতে যোগ দেন রোনালদো।
সেই ছোট্ট দ্বীপ থেকে উঠে এসে একসময় বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি। শুধু ফুটবল মাঠেই নয়, বিশ্বখ্যাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মুখ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেন নিজেকে।
নিজের জন্মভূমি মাদেইরায় রোনালদোর নামে রয়েছে একটি জাদুঘর। তার নামেই রাখা হয়েছে সেখানকার বিমানবন্দরের নামও।
এবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের পর তাকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার পরিকল্পনা জানিয়েছে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন।
শেষটা যতই বিতর্কিত হোক, পর্তুগালের ফুটবলে রোনালদোর অবদান আড়াল করার সুযোগ নেই। ২৩ বছরের ক্যারিয়ারে দেশটির ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি।
গোল আর শিরোপার রেকর্ড একদিন হয়তো অন্য কেউ ভেঙে দেবেন। তবে পর্তুগালের ফুটবলে রোনালদোর রেখে যাওয়া প্রভাব মুছে যাওয়া সহজ নয়।

বিজ্ঞাপন

Recommended For You