
বাংলা রিডার ডেস্ক
২৫ বছর পর ইংল্যান্ডের কোনো ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জিতেছেন হ্যারি কেইন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে ফুটবলবিশ্বে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ব্যক্তিগত এই পুরস্কারের ইতিহাস। সোমবার (২৬ অক্টোবর) লন্ডনে জমকালো অনুষ্ঠানে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জেতেন বায়ার্ন মিউনিখের ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন।
তবে ফুটবল ইতিহাসের দুই কিংবদন্তি পেলে ও দিয়েগো ম্যারাডোনা কেন কখনো ব্যালন ডি’অর জেতেননি, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে।
গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোল করেন তিনি। তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বায়ার্ন জেতে জার্মানির ঘরোয়া লিগ ও কাপের শিরোপা।
বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কেইন। ভোটে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালকে পেছনে ফেলে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জেতেন ৩৩ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার।
২০০১ সালে মাইকেল ওয়েনের পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এই সম্মান পেলেন তিনি।
কেইনের এই অর্জন ফুটবল ইতিহাসের সেরাদের নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
কারণ, ফুটবলের ইতিহাসে এমন দুই কিংবদন্তি রয়েছেন, যারা অসাধারণ কীর্তি গড়েও কখনো প্রতিযোগিতামূলক ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি। তারা হলেন ব্রাজিলের পেলে ও আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা।
অথচ পেলে তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছেন, আর ম্যারাডোনার নেতৃত্বে ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। তাহলে কেন এই দুই মহাতারকার নাম নেই ব্যালন ডি’অরের আনুষ্ঠানিক বিজয়ীদের তালিকায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পুরস্কারটির পুরোনো যোগ্যতার নিয়মে।
১৯৫৬ সালে ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ব্যালন ডি’অর চালু করে। তবে শুরুর দিকে এই পুরস্কারের জন্য কেবল ইউরোপীয় দেশের ফুটবলাররাই বিবেচিত হতেন। ফলে পেলে কিংবা ম্যারাডোনার মতো দক্ষিণ আমেরিকার কিংবদন্তিরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পুরস্কারটির জন্য বিবেচিত হতে পারেননি।
পেলে ছিলেন ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা। ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ক্লাব ফুটবলে সান্তোসের হয়েও অসংখ্য সাফল্য পেয়েছেন। কিন্তু ব্রাজিলিয়ান হওয়ায় ব্যালন ডি’অরের পুরোনো নিয়মে তিনি পুরস্কারটির জন্য যোগ্য ছিলেন না।
একই কারণে বঞ্চিত হন ম্যারাডোনাও। আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তি ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে দলকে শিরোপা এনে দেন। ক্লাব ফুটবলেও নাপোলির হয়ে ইতিহাস গড়েন তিনি। কিন্তু আর্জেন্টাইন হওয়ায় তখনকার নিয়মে ব্যালন ডি’অর জেতার সুযোগ ছিল না তার।
১৯৯৫ সালে ব্যালন ডি’অরের নিয়মে পরিবর্তন আসে। তখন থেকে ইউরোপের ক্লাবগুলোতে খেলা যেকোনো দেশের ফুটবলার এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পান। ওই বছরই লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়াহ ব্যালন ডি’অর জিতে ইতিহাস গড়েন। তবে তখনও ইউরোপের বাইরের ক্লাবে খেলা ফুটবলারদের জন্য পুরস্কারটি উন্মুক্ত হয়নি। ২০০৭ সালে নিয়ম আরও সম্প্রসারিত হয়। এরপর বিশ্বের যেকোনো দেশের এবং যেকোনো ক্লাবে খেলা ফুটবলার ব্যালন ডি’অরের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ পান।
তবে নিয়ম বদলানোর আগেই পেলে ও ম্যারাডোনার খেলোয়াড়ি জীবনের সেরা সময় পেরিয়ে যায়। ফলে ব্যালন ডি’অরের মূল পুরস্কার জেতার সুযোগ তাদের আর হয়নি। যদিও তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছে ফুটবল বিশ্ব। ১৯৯৫ সালে ম্যারাডোনাকে সম্মানসূচক ব্যালন ডি’অর দেওয়া হয়। আর ২০১৪ সালে পেলের হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মানসূচক ফিফা ব্যালন ডি’অর।
ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে তাই পেলে ও ম্যারাডোনার নাম নিয়মিত বিজয়ীদের তালিকায় না থাকলেও ফুটবল ইতিহাসে তাদের অবস্থান নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আর ২০২৬ সালে হ্যারি কেইনের হাতে পুরস্কারটি ওঠার পর আবারও সামনে এসেছে সেই প্রশ্ন, ব্যালন ডি’অর কি সব সময়ই ফুটবলের সেরাদের স্বীকৃতি দিতে পেরেছে?



