বিশ্বকাপের ভিসা প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্নের মুখে যুক্তরাষ্ট্র, সমালোচনায় ফিফা

বাংলা রিডার ডেস্ক
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার সময় দেওয়া ভিসা-সংক্রান্ত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাও সমালোচনার মুখে পড়েছে।

কিন্তু টুর্নামেন্ট মাঠে গড়াতেই দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন ফিফাকে দেওয়া অঙ্গীকারকে পায়ে মাড়িয়ে নিয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ।

এর মধ্যে ভিসা-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সোমালিয়ার এক আন্তর্জাতিক রেফারিকে প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং ইরান দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের ভিসা ও যাতায়াতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র টুর্নামেন্টজুড়ে সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। এই পুরো পরিস্থিতিতে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’র মতো ভূমিকা জন্ম দিয়েছে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্নের; ফিফা কি আসলে তার নিজের নিয়ম রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পুরোপুরি অসহায়?
গত ১১ জুন থেকে শুরু হয়েছে এবারের ফিফা বিশ্বকাপ।

এই প্রথম ৪৮টি দেশ নিয়ে আয়োজিত মহাযজ্ঞটি যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো আয়োজন করেছে। ১৯ জুলাই গ্রান্ড ফাইনালের মধ্য দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আসরের পর্দা নামবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফুটবলকে বলা হয় সম্প্রীতির খেলা, যেখানে ভেদাভেদ ভুলে এক সমতলে দাঁড়ায় পুরো বিশ্ব। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বৈষম্যমূলক ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সেই সৌন্দর্যে বড় একটি দাগ ফেলে দিয়েছে। ফিফার বিডিং নীতিমালা ভঙ্গ করে সোমালিয়ার রেফারিকে প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং যুদ্ধ ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে ইরান দলের ওপর নানা বিধি-নিষেধ আরোপের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ক্রীড়াকেন্দ্রিক স্পিরিটকেই ধ্বংস করে দিয়েছে।

সোমালিয়ান রেফারির সঙ্গে যা ঘটলো
আসরের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও সমালোচিত ঘটনাটি ঘটেছে সোমালিয়ার আন্তর্জাতিক রেফারি ওমর আবদুল কাদির আরতানের সঙ্গে। আফ্রিকার অন্যতম সেরা এই রেফারি ফিফার চূড়ান্ত তালিকায় থাকা ৫২ জন ম্যাচ অফিশিয়ালের একজন ছিলেন। প্রথম সোমালিয়ান হিসেবে বিশ্বকাপে বাঁশি বাজানোর স্বপ্ন নিয়ে গত ৯ জুন তিনি পা রেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।

কিন্তু বৈধ কাগজপত্র ও সঠিক ভিসা থাকা সত্ত্বেও মার্কিন অভিবাসন বিভাগ তাকে আটকে দেয়। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যোগসূত্র’ থাকার অজুহাতে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে তুরস্কগামী বিমানে করে ফেরত পাঠানো হয়। আরতান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তাকে সোমালিয়ার জঙ্গিগোষ্ঠী আল শাবাবের বিষয়ে এমন সব প্রশ্ন করা হয়েছিল, যার সঙ্গে তার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।

এটি কেবলই তার স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং একে প্রকাশ্য বর্ণবাদী আচরণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে ফিফা তাকে পুরো টুর্নামেন্টের ম্যাচ ফি দেওয়ার ঘোষণা দিলেও ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় গৌরব থেকে বঞ্চিত হলেন এই রেফারি।

ইরান দলের সঙ্গে ‘নিপীড়নমূলক’ আচরণ
যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক শত্রুতার কোপ এসে পড়েছে ইরান ফুটবল দলের ওপর। এমনিতেই মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল, তবে স্পোর্টিং স্পিরিট ধরে রেখে ইরান টুর্নামেন্ট বর্জন করেনি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখার পর থেকেই তাদের পড়তে হয়েছে চরম বৈষম্যের মুখে।

১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইরানের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে ভিসা জটিলতা চরমে পৌঁছায়। ইরানের ১৫ জনের প্রতিনিধি দলের প্রথম দফার আবেদন সরাসরি নাকচ হয়। দ্বিতীয় দফায় ১০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জনকে ভিসা দেওয়া হয়। ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজসহ দলের শীর্ষ কর্মকর্তারা ভিসাই পাননি।

শুধু তাই নয়, ইরান দলকে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ধরনের অনুশীলন ক্যাম্প করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে তারা মেক্সিকোর তিহুয়ানা শহরে অস্থায়ী ক্যাম্প করে প্রস্তুতি নেয় এবং ম্যাচের ঠিক আগের দিন তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। সবচেয়ে অমানবিক ঘটনা ঘটে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করার পর।

ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রশাসন ইরান দলকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। ফলে ন্যূনতম বিশ্রামের সুযোগ না পেয়ে ম্যাচ শেষেই খেলোয়াড়দের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার ভ্রমণ করে আবার মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হয়। ইরানের কোচ আমির গালেনোই ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজেদের এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে ‘নিপীড়িত’ দল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

অতীতে ১৯৫০, ২০১৪ বা ২০১৮ বিশ্বকাপে বর্ণবাদ বা দর্শকদের বাধা দেওয়ার বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও, সরাসরি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো দল বা ম্যাচ অফিশিয়ালকে এভাবে হেনস্তা করার নজির আধুনিক ফুটবলে বিরল।

ফিফার মেরুদণ্ডহীনতা
এই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বৈষম্যের মুখে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বক্তব্য ফুটবলপ্রেমীদের আরও হতাশ করেছে। সমালোচনার জবাবে তিনি কিছুটা অসহায় সুরেই বলেন, ‘আমরা সবসময় সমাধানের পথ খুঁজি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা বিশ্বের রাজা নই। আমরা কোনো দেশের সরকার বা পুলিশ বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমরা একটা ক্রীড়া সংস্থা মাত্র।’

ফিফার এই পিছু হটাকে সংস্থাটির বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকট ও মেরুদণ্ডহীনতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের ফুটবল বিশ্লেষক ও সাংবাদিক রায়হান আল মুঘনি এই বিষয়ে বলেন, ‘বৈশ্বিক আসরগুলোতে সবার জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা ফিফার মূল দায়িত্ব। একজন আন্তর্জাতিক রেফারিকে এভাবে অপমানজনকভাবে বিমানবন্দর থেকে বের করে দেওয়া খেলার মূল স্পিরিটের পরিপন্থী। এখানে ফিফার আরও কঠোর ও শক্তিশালী ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল। সেটি করতে না পারা নিশ্চিতভাবেই ফিফার এক বড় ব্যর্থতা।’

যুক্তরাষ্ট্রের এই একচ্ছত্র আধিপত্য ও ফিফার নতিস্বীকার ফুটবল বিশ্বকাপের নিরপেক্ষতা এবং বিশ্বজনীন আবেদনকে এক বড় সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।

বিজ্ঞাপন

Recommended For You