নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান 

বাংলা রিডার ডেস্ক

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্থান-পতন, নাটকীয় পরিবর্তন ও অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তনের ঘটনা নতুন নয়। সেই ধারাবাহিকতায় দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তারেক রহমান। কারাবাস ও দীর্ঘ নির্বাসন পেরিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় এনে তিনি এখন রাষ্ট্রের নেতৃত্বে।

শৈশব ও পারিবারিক উত্তরাধিকার

১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তারেক রহমান। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র। মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের মাধ্যমে ইতিহাসে স্থান করে নেন এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

রাষ্ট্রপতির সন্তান হিসেবে শৈশব কাটলেও ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে পরিবারটির জীবনে নেমে আসে বড় ধাক্কা। কৈশোরেই তারেক রহমান প্রত্যক্ষ করেন ক্ষমতা ও নিরাপত্তা হারানোর বাস্তবতা।

তিনি ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পাশ্চাত্য রাজনৈতিক দর্শনের বিভিন্ন চিন্তাবিদদের ধারণা তার রাজনৈতিক বোধ গঠনে প্রভাব ফেলে।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক শিক্ষা

স্বামী হত্যার পর দীর্ঘ সময় রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও পরে দলের আহ্বানে রাজনীতিতে সক্রিয় হন খালেদা জিয়া। তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বে পরিণত হন এবং ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

এই সময় থেকেই তারেক রহমান দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে শুরু করেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং পরবর্তীতে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান।

বিতর্ক, কারাবাস ও নির্বাসন

২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় তারেক রহমানকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দলীয় সূত্রে অভিযোগ করা হয়, রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হন তিনি।

২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান তারেক রহমান। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি সেখানেই অবস্থান করেন, যা কার্যত তার রাজনৈতিক নির্বাসনে রূপ নেয়। তবে বিদেশে থেকেও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।

২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দী হলে তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দল পরিচালনা করেন তিনি।

দেশে ফেরা ও নতুন অধ্যায়

প্রায় ১৭ বছর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। অল্প সময়ের মধ্যেই মায়ের মৃত্যু তার জন্য ব্যক্তিগত শোকের কারণ হলেও রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নেতৃত্বে বিএনপি জোট ২৯৭টির মধ্যে ২১২টি আসনে জয় পায়। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর সংসদীয় দলের বৈঠকে তাকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।

নেতৃত্বের শীর্ষে

কৈশোরে পিতৃহত্যা, পরবর্তীতে কারাবাস ও দীর্ঘ নির্বাসন—বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। তার রাজনৈতিক যাত্রা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তারেক রহমানের এই উত্থান কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতারও প্রতিফলন—যেখানে পতনের পরও প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা থেকে যায়।

বিজ্ঞাপন

Recommended For You