সরকার গঠন করলে প্রথম দিন ফজরের নামাজের পরই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করব: ডা. শফিকুর রহমান

বাংলা রিডার ডেস্ক
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আল্লাহর ইচ্ছা ও জনগণের ভালোবাসায় সরকার গঠনের সুযোগ পেলে প্রথম দিন ফজরের নামাজ আদায় করেই রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে। মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়তে দল-মত নির্বিশেষে সবার মান-ইজ্জত, নিরাপত্তা ও অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তিনি।

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ভাষণটি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সবার দেশ। এখানে কেউ ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বসবাস করবে না। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে আঘাত করার চেষ্টা হলে অতীতের মতো ভবিষ্যতেও তা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ভোগের বিষয় নয়; বরং এটি একটি আমানত, যেখানে প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল।

তিনি আরও বলেন, এমন একটি দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখায় জামায়াতে ইসলামী, যেখানে কোনো মা-বোন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন না। অধিকার রক্ষার সংগ্রামে সবাইকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি একটি আধুনিক ও উন্নত দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে জামায়াতকে নির্বাচিত করার অনুরোধ জানান।
ভাষণে তিনি জুলাইয়ের শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন হয়েছিল বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে। তরুণ, শ্রমজীবী মানুষ, নারী, পেশাজীবী শ্রেণি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ঐক্যই সেই আন্দোলনের শক্তি ছিল।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারতন্ত্র ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকার কারণেই জুলাইয়ের মতো রক্তাক্ত অধ্যায় এসেছে। ২০০৯ সালের পর মানবাধিকার, ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। এসব অবিচার থেকে মুক্তির জন্যই জনগণ আন্দোলনে নেমেছিল।

তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ দেখতে চায়—যেখানে সাহস, মেধা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ গড়া হবে। এই তরুণরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মাণ করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভাজনের রাজনীতি নয়, ঐক্যের বাংলাদেশই জামায়াতের লক্ষ্য।

রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে গৃহীত সংস্কার পরিকল্পনার অনেকগুলো এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। এসব সংস্কার নিশ্চিত করতেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জামায়াত আমির বলেন, ‘পলিসি সামিট’-এর মাধ্যমে জনগণের সামনে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ও কৌশল তুলে ধরেছে জামায়াতে ইসলামী। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতের ভিত্তিতেই নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে। সুযোগ পেলে সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে হাত দেওয়া হবে।

তিনি অভিযোগ করেন, অতীতের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও লুটপাটের এই ব্যবস্থার অবসান ঘটানোই জামায়াতের প্রধান লক্ষ্য। অতীতে জামায়াতের প্রতিনিধিরা দুর্নীতিমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

আগামী নির্বাচনকে জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে লুটেরা গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ার পথ তৈরি হবে। তিনি বলেন, সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে ‘হ্যাঁ’ এবং দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজিকে ‘না’ বলার আহ্বান জানানো হয়েছে জামায়াতের ইশতেহারে।
নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে সমাজ নারীর সম্মান রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। ক্ষমতায় এলে নারীরা রাষ্ট্র ও সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে সম্মানের সঙ্গে অংশ নেবেন বলে তিনি আশ্বাস দেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জলবায়ু ইস্যুতে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রবাসীদের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার যাত্রায় প্রবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাদের অধিকার ও মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
সবশেষে জামায়াত আমির বলেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করা সব রাজনৈতিক দলের নৈতিক দায়িত্ব। নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অধিকারকে সম্মান করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় জামায়াতে ইসলামী অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে, ইনশাআল্লাহ।

বিজ্ঞাপন

Recommended For You