আগামী দিনে সরকার হবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ: তারেক রহমান

বাংলা রিডার ডেস্ক
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আগামী দিনে সরকার হবে জনগণের কাছে সম্পূর্ণভাবে দায়বদ্ধ। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের সমর্থন পেলে বিএনপি সরকার দুর্নীতি দমনে সর্বোচ্চ কঠোরতা দেখাবে এবং দেশে পুনরায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। এটি দেশবাসীর কাছে তাঁর ব্যক্তিগত অঙ্গীকার এবং বিএনপির অঙ্গীকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। ভাষণটি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে একযোগে সম্প্রচার করা হয়।

তারেক রহমান বলেন, জনগণের কাছে রাষ্ট্র ও সরকারকে দায়বদ্ধ রাখার কোনো বিকল্প নেই। জনগণই বিএনপির সব রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল উৎস। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির তথাকথিত ডামি নির্বাচনে জনগণকে ভোট বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। আজ ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদিন ধানের শীষে ভোট দিন এবং তারুণ্যের প্রথম ভোট ধানের শীষের জন্য উৎসর্গ করুন।
তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ ধানের শীষের প্রার্থীদের দায়িত্ব নেবে, আর ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচিত এমপিরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব তিনি নিজেই নেবেন বলে আশ্বাস দেন। তিনি আরও বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হবে মহানবীর (সা.) ন্যায়বিচারের আদর্শ অনুসরণ করা।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে দীর্ঘদিন ধরে দলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলেও তিনি সরাসরি সরকারের অংশ ছিলেন না। তবে একজন কর্মী হিসেবে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ঘুরে জনগণের সমস্যা ও সম্ভাবনা বোঝার চেষ্টা করেছেন। বিদেশে অবস্থান করলেও বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে তাঁর মানসিক সংযোগ অটুট ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, অতীতে বিএনপি সরকার পরিচালনার সময় অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলে সেজন্য তিনি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছেন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তেই আবারও জনগণের সমর্থন চান তিনি।

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু পতিত শাসকগোষ্ঠী জনগণের কাছ থেকে রাষ্ট্রের মালিকানা ও গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে জনগণের হাতে আবারও রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরে এসেছে।

তিনি জানান, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করতে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছে। স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী, বেকার জনগোষ্ঠী ও নারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই বিএনপির প্রধান অগ্রাধিকার।

তারেক রহমান বলেন, ব্যাংক, বিমা ও পুঁজিবাজার সংস্কার, শিল্প-বাণিজ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অঞ্চলভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে দেশে ও বিদেশে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে বেকার জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা হবে। কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনামূল্যে স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি জানান, বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখের বেশি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চশিক্ষিত তরুণ। বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে শিক্ষিত বেকার তরুণদের জন্য ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত বিশেষ আর্থিক ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, দেশের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে নারীশক্তিকে মূলধারায় আনতে হবে। বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি পরিবারের জন্য নারীর নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইস্যু করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে মাসিক আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। তিনি একে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন।
কৃষি খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষকের স্বার্থ রক্ষা মানেই দেশের স্বার্থ রক্ষা। এজন্য কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষাখাতে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি একাধিক ভাষা শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে তিনি বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসা পৌঁছে দিতে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাদের অধিকাংশই হবেন নারী।

সবশেষে তারেক রহমান বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তরুণ সমাজকে দক্ষ করে তুলতে আইসিটি খাতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধ করা গেলে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড ও বেকার ভাতার মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিজ্ঞাপন

Recommended For You