দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও চাঁদপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থীতা

চাঁদপুর-৩ নির্বাচনে আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী আজম খানের সাথে আমার পরিচয় সাউথ আফ্রিকার কেপটাউন শহরে।

ওই সময়ে সাউথ আফ্রিকায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বর্তমানে এই সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণে আমি তখন ছিলাম জোহান্সবার্গ-এ রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে। কয়েকদিন পর সাউথ আফ্রিকার অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত ডারবান ও ক্যাপটাউন ভ্রমণ করলাম।

যেদিন বাংলাদেশে ফিরব তার আগেরদিন সকালে ফোন দিলেন আজম খান। বললেন রাষ্ট্রদূত তৌহিদ হোসেন ভাই আপনার কথা বলেছে। আমি একটু দেখা করতে চাই।

একটি রেস্টুরেন্টে মিলিত হলাম। পরিচয়ে জানলাম তিনি আমার পাশের গ্রামের অধিবাসী। আমার বাবা এবং আজম খানের বাবা খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

তখন জানলাম, তিনি সাউথ আফ্রিকার একজন বড় ব্যবসায়ী। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে তাঁর যোগাযোগ। প্রভাবশালীদের সাথে উঠাবসা। সাধারণত প্রবাসী বাংলাদেশিদের এড়িয়ে চলেন।

আজম খান আমার সাথে দেখা করেছেন রাষ্ট্রদূত তৌহিদ হোসেন এর অনুরোধে। এখন জানলেন, আমি তাঁর আপনজন। আমরা পারিবারিকভাবেও ঘনিষ্ঠ। তিনি দামি গাড়িতে নিজের ড্রাইভ করে আমাকে নিয়ে ঘুরতে বের হলেন। ক্যাপটাউনের সমুদ্র সৈকত এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার পর আমরা একসাথে ডিনার করলাম।

পরদিন আমি দেশে ফিরব। আজম খান আমাকে নিয়ে গেলেন ক্যাপটাউনের সবচেয়ে অভিজাত একটি ব্র্যান্ড মার্কেটে। দামি রেস্টুরেন্টে একসাথে লাঞ্চ করলাম। আমার আপত্তি উপেক্ষা করে খুবই দামী এমন কিছু উপহার কিনে দিলেন যা অকল্পনীয়। এরপর এয়ারপোর্টে আমাকে বিদায় জানালেন। মনে হয়েছে আজম খান একজন সজ্জন ভদ্রলোক, অতি বিনয়ী। তাঁর আতিথিয়তা ছিল খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ।
এরপর আজ পর্যন্ত আজম খানের সাথে আমার দেখা হয়নি। কিন্তু কথা হয়েছে।

আজম খান ছিলেন আওয়ামীলীগ সরকারের রোষানলে। সাউথ আফ্রিকায় শেখ হাসিনার ভ্রমণ কালে প্রবাসীদের বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই আজম খান। এরপর থেকে তিনি আলোচনায় এবং বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নজরে পড়েন।
শেখ হাসিনার পুরো সময়কালে আজম খান আর দেশে ফিরতে পারেননি বিভিন্ন মামলায় কারণে। হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে আজম খান দেশে ফেরেন।

আজম খান বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জেলা বিএনপির উপদেষ্টা। তাঁর ফিরে আসার পর থেকেই চাঁদপুর–৩ আসনের রাজনীতিতে এক নতুন গতি তৈরি হয়। গ্রামে গ্রামে তার সফর, পথসভা, স্থানীয় নেতা–কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক, আর সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে খোলা আলাপ রাজনীতির মাঠে এক ধরনের নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
শেখ ফরিদ আহমেদ মানিককে যারা পছন্দ করেন না তারা সবাই আজম খানকে সমর্থন করছেন। এইজন্য জেলা উপজেলা ইউনিয়ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকর্মীকে পাশে পাচ্ছেন না।

গত আগস্ট মাসে আজম খান চাঁদপুর শহরে একটি সমাবেশের আয়োজন করতে চেয়ে ছিলেন। কিন্তু বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠন সমূহের একদল নেতাকর্মীর হামলায় তা পন্ড হয়ে যায়। উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীরা আজম খানের বাসভবনে হামলা চালায়। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়।

আজম খান এই ঘটনার জন্য তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ ফরিদ আহমেদ মানিককে দায়ী করেন। অপ্রত্যাশিত এই হামলার ঘটনায় বিএনপির হাইকমান্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

এরপর আজম খান বিদেশে চলে যান। এখন আবার দেশে এসে প্রচারণা কার্যক্রম শুরু করেছেন।‌

তাঁর সমর্থকদের দাবি, আজম খান দীর্ঘদিন ধরে দলের পাশে রয়েছেন অর্থনৈতিকভাবে। বিএনপির কঠিন সময়ে বিদেশ থেকে অর্থ ও সহায়তা পাঠিয়ে তিনি সংগঠনকে টিকিয়ে রেখেছেন। দেশে ফিরে এখন সরাসরি মাঠে নেমেছেন।

তাঁর অনুসারীদের ভাষায়— “পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও নতুন নেতৃত্বই এখন দরকার—আজম ভাই সেই পরিবর্তনের প্রতীক।”
আমি যতোটুকু জেনেছি, দলের ভেতরে আজম খানের শক্তি মূলত তাঁর কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ও প্রবাসী প্রভাব। তাঁর সমর্থকরা মনে করেন, মাঠের পাশাপাশি তাঁর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির, সততা ও আর্থিক সক্ষমতার কারণে তিনিই আগামীর উপযুক্ত নেতা।

অনেকে মনে করছেন, আজম খানের প্রভাবে কেন্দ্র এখনো প্রার্থী হিসেবে শেখ ফরিদ আহমেদের নাম ঘোষণা করছেন না। তিনি নিজেই প্রার্থী হতে জোর তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের অধিকাংশ নেতাই তাকে সমর্থন করছেন না। পুরো দল শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ।

চাঁদপুর-৩ নির্বাচনী এলাকায় একটি বিষয় খুবই আলোচনায়। মানুষ মনে করছে, বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে জনপ্রিয় ত্যাগী নেতা শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রভাব কাজ করছে।

এসব প্রভাবশালীরা আজম খানের পক্ষে কাজ করছেন এবং মানিকের বিরুদ্ধে সম্প্রতিককালে বিভিন্ন অনিয়ম, চাঁদাবাজির অতিরঞ্জিত অভিযোগ এনে হাইকমান্ডের কান ভারি করছেন।

এদিকে বিএনপি’র প্রার্থী ঘোষণায় বিলম্ব হলেও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জোরেশোরে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত কয়েক মাসে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।

প্রার্থী এডভোকেট শাহজাহান মিয়া জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি। আইনজীবী এবং সমাজ সেবক হিসেবে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি রয়েছে তার। স্থানীয়ভাবে তিনি সজ্জন, নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয়। তরুণ ভোটার ও ধর্মভিত্তিক শ্রেণির মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা স্পষ্ট।

শাহজাহান মিয়া গ্রামের ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছেন। দলীয় প্রার্থী নিশ্চিত হয়ে তিনি প্রকাশ্যে নির্বাচনী কার্যক্রম, প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু এক্ষেত্রে বিএনপি’র অবস্থান দুর্বল। একমাত্র জেলা বিএনপি’র সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিককের সরব উপস্থিতি ছাড়া আজম খানের তেমন কার্যক্রম চোখে পড়ছে না।

শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এখন বেশিরভাগ সময়ই তার নির্বাচনী এলাকায় সক্রিয়। অনেকেই বলছেন, প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এই নেতার নেতৃত্বে জেলা বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা শহর থেকে গ্রাম ইউনিয়ন ওয়ার্ড পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ।

যদিও বিএনপি একটি খন্ডিত অংশ আজম খানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। যারা শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এর বিরোধীপক্ষ হিসেবে পরিচিত।

এদিকে একটি সাংগঠনিক মন্তব্য এখন গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে— “বিএনপি যদি বিভক্ত থাকে, জামায়াতই হবে ফ্যাক্টর।”
জামায়াতের প্রচারণায় বলা হচ্ছে—“দাঁড়িপাল্লা শুধু প্রতীক নয়, এটি ন্যায়, সততা ও পরিবর্তনের প্রতীক। জনগণ জেগে উঠেছে, ইনশাআল্লাহ জনগণের ভোটে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে।”

তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বিএনপি’র প্রার্থী ঘোষণা বিলম্বের অন্যতম কারণ হচ্ছে কিছু বিতর্ক এবং সমালোচনা।
সরকার পতনের পর চাঁদপুর জেলা বিএনপির কিছু নেতা–কর্মী আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে নিরাপত্তা দিয়েছেন; কেউ কেউ দখলবাজি ও চাঁদাবাজিতেও জড়িয়ে পড়েছেন। যার দায় পড়েছে জেলা সভাপতির উপর।

যদিও বিএনপি’র অধিকাংশ কর্মীরা মনে করছেন, জেলা সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছেন। তাঁর নিয়ন্ত্রণে এখন সংগঠন অনেক বেশি শৃঙ্খল। তিনি কোন অন্যায় বা প্রভাব, দখলবাজ, চাঁদাবাজকে প্রশ্রয় দেননি।
মানিকের সমর্থকদের দাবি ৫ আগস্টের পর উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে চাঁদপুর শহরকে শান্ত রাখার কৃতিত্বও তাঁর। দুই ঈদ ও দুর্গাপূজায় বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক দল সক্রিয়ভাবে মাঠে থেকে জনসেবামূলক কাজ করেছে—যা জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

একজন প্রবীণ ভোটার বললেন— “মানিক ভাই ভালো মানুষ, কিন্তু দলের কিছু সুবিধাবাদী তাঁদের অপকর্মের মাধ্যমে তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে।”

আজম খানের সমর্থকরা বলছেন, ভোটাররা দূর্নীতি-অনিয়ম চাঁদাবাজি পছন্দ করেন না। এইজন্য বিকল্প হিসেবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির ভদ্রলোক আজম খানকে তারা বেছে নেবেন।

জেলা বিএনপি’র একজন সহ সভাপতি বলেন, জোর করে চাপিয়ে দেয়া হলে দল বিভক্ত হবে, অসন্তোষ বাড়বে। এই আসনে শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এর বিকল্প অন্য কেউ নেই। নতুন কাউকে চাপিয়ে দেয়া হলে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
তবু বিএনপির মূল কর্মীরা বিশ্বাস করেন, মাঠে ধানের শীষের ঢেউ উঠলে এসব বিতর্ক মিলিয়ে যাবে।

সাংবাদিক হেলাল উদ্দিন এর ফেসবুক পেজ থেকে

বিজ্ঞাপন

Recommended For You