সাগর-রুনি হত্যা: জিও-লোকেশন ও আলামতে নতুন সন্দেহ, নেপথ্যে কারা?

বাংলা রিডার ডেস্ক
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে পাওয়া জিও-লোকেশন, এসএমএস ও কল ডিটেইলস রেকর্ডের (সিডিআর) মুদ্রিত কপি ঘিরে মামলাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

উদ্ধার হওয়া এসব নথিতে কী ধরনের তথ্য রয়েছে এবং সেগুলোর সঙ্গে সাগর-রুনি হত্যা মামলার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এসব তথ্য মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সূত্র দিতে পারে কি না, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা যাচাই ও তদন্তে সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণের ওপর।

পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের হাতে এসব তথ্য হাতে আসে। প্রসিকিউশন কিছু নথি যাচাই করে প্রাথমিকভাবে দুই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার কথা জানায়।

আর প্রসিকিউশনের বরাতে ‘হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত টাস্কফোর্স তদন্তকৃত সাংবাদিক দম্পতি হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে’ নতুন এ তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
প্রসিকিউশনের বরাতে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

বিষয়টি তদন্ত করে যাচাই-বাছাই করছে প্রসিকিউশন। এ ছাড়া প্রতিবেদনে ডিএনএ, সাক্ষী ও জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি তাদের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ওই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি রুনির ভাই নওশের আলী রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। প্রথমে মামলাটির তদন্ত করেন শেরেবাংলা নগর থানার এক কর্মকর্তা। একই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্তভার পড়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. রবিউল আলমের ওপর। দুই মাস পর হাইকোর্টের আদেশে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‍্যাব)। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি সংস্থাটি।

২০১২ সালে হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তারের দাবিতে জনস্বার্থে রিট করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ। সেই রিটের শুনানি নিয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি জারি করা রুলে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের খুনিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চান হাইকোর্ট।

এ অবস্থায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করে। পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদন দাখিলের সময় কয়েক দফা বাড়ানো হয়।

টাস্কফোর্সের সচিব ও তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিজুল হক অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেন।

প্রতিবেদনের ‘বিশেষ পর্যবেক্ষণ’ অংশে বলা হয়, ডিএনএ পরীক্ষার প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, সাগরকে বাঁধার জন্য ব্যবহৃত চাদর এবং রুনির টি-শার্ট থেকে পাওয়া নমুনা পরীক্ষায় দুটি অপরিচিত পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়। এসব অজ্ঞাত অপরাধীকে শনাক্ত করতে ডিএনএ প্রস্তুতকারী যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ল্যাব সম্ভাব্য প্রচেষ্টা চালিয়েও ছবি প্রস্তুত করতে পারেনি। কারণ হিসেবে ডিএনএর অধিক মিশ্রণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া তদন্তে পাওয়া সন্দেহভাজন সব ব্যক্তি ও আসামির ডিএনএর সঙ্গে ওই অজ্ঞাত ডিএনএ মেলে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়।

তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতির বিষয়ে বলা হয়, মামলাটি তদন্তকালে আগের তদন্তকারী কর্মকর্তারা মোট ১৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। টাস্কফোর্স তদন্তকালে ৯০ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ২৪ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করে। এ ছাড়া ভিসেরা রিপোর্ট পর্যালোচনায় চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

মামলার আলামত ও ২৫ জন ব্যক্তির সোয়াব সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুটি এবং নেদারল্যান্ডসের একটি ল্যাবে পাঠানো হয়। আলামত থেকে পাওয়া ডিএনএর সঙ্গে পাঠানো ব্যক্তিদের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়নি। ওই প্রতিবেদনে পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘটনাস্থলে মোট চারজনের ডিএনএ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী। তিনজন পুরুষের মধ্যে একজন ভুক্তভোগী সাগর এবং নারীটি রুনি বলে শনাক্ত হন। বাকি দুই অজ্ঞাত পুরুষের পরিচয় উদ্ঘাটন করা যায়নি। তাদের ডিএনএ থেকে ছবি তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি ছবি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে নমুনা পাঠানো হয়। কিন্তু ডিএনএতে অধিক মিশ্রণের কারণে প্রতিষ্ঠানটি ছবি প্রস্তুত করতে পারেনি। দীর্ঘ তদন্তেও ওই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য এবং কারা এতে জড়িত, তা আজ অবধি নির্দিষ্ট করা যায়নি।

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে একজনকে হত্যার পর অপরজন আত্মহত্যা করেছেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, দুজনকেই হত্যা করা হয়েছে। পেশাগত কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন এ দম্পতি দেশের বাইরে জার্মানিতে ছিলেন। মৃত্যুর সাত মাস আগে তারা দেশে আসেন। সাগরের কর্মস্থল মাছরাঙা টিভির সহকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে পেশাগত দিক থেকে তার কোনো শত্রুতা বা বিরোধের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া প্রতিবেদনে বলা হয়, সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্ট ২০১৫ সালে কার্যক্রম শুরু করে। এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে। সাগর-রুনির মৃত্যুর পর নির্মাণকাজ ও কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সামিট গ্রুপের সঙ্গে তাদের হত্যাকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। অর্থ ও জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না, তদন্তকালে এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাদের কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন বা ধারকর্জের তথ্যও পাওয়া যায়নি। গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কারও সঙ্গে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ ছিল না। দাম্পত্য কলহের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।

ভবনের নিরাপত্তারক্ষী সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মামলার ঘটনাস্থলের ভবনের নিরাপত্তারক্ষী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবিরকে র‍্যাব সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ২০১৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করে। তিনি এখনো কারাগারে আছেন। আদালতের নির্দেশে কাশিমপুর কারাগারে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখন তার মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায় এবং তিনি ঠিকমতো উত্তর দিতে না পারায় আদালতের অনুমতি নিয়ে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। একই সঙ্গে একজন আইনজীবী তার চিকিৎসার জন্য আবেদন করলে আদালত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে আসামিকে পরীক্ষা করে আগামী ৫ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

প্রতিবেদনের মন্তব্য অংশে বলা হয়, এ মামলায় লুণ্ঠিত মোবাইল ফোন সেট ও দুটি ল্যাপটপ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাগর-রুনি হত্যা মামলার মিডিয়া মুখপাত্র ও সাবেক ডিএমপি-ডিবি প্রধান মনিরুল ইসলাম এবং সাবেক র‍্যাব মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যায়নি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। সাংবাদিক রুমী নোমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, উল্লিখিত ব্যক্তিদের তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।

নতুন তথ্য সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩০ আগস্ট বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা এক বক্তব্যে বলেন, এনটিএমসির সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় দুদক অভিযান চালায়। সেখানে বেশ কিছু ডিজিটাল আলামত জব্দ করে দুদক। এসব আলামতের মধ্যে বিভিন্ন জিও-লোকেশন, এসএমএস ও সিডিআরের প্রিন্টেড ভার্সন ছিল। এ-সংক্রান্ত বিষয়ে জিয়াউল আহসানের সহকারী এক সেনাসদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই প্রসিকিউটর প্রাথমিক তদন্তে জিয়াউল আহসান এবং একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কথা জানান। এ বক্তব্য সমর্থন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও একই ধরনের বক্তব্য দেন।

পরে টাস্কফোর্সের সঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর ও প্রসিকিউটরের আলোচনাকালে তারা জানান, প্রাথমিকভাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তাদের প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে প্রাপ্ত তথ্য পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও তারা জানান। এ অবস্থায় গত ১৩ অক্টোবর তাদের কাছে সংরক্ষিত মামলার ডিজিটাল আলামত ও তথ্য-উপাত্ত তদন্তের জন্য হস্তান্তর করতে আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মামলাটির মূল রহস্য উদঘাটন, অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত তদন্ত করে যাচাই-বাছাই এবং সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের লক্ষ্যে তদন্তকাজ সম্পন্ন করতে আরও সময় প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বলেন, জিয়াউল আহসানের কাছ থেকে উদ্ধার করা প্রায় ৩০০টি সিডিতে অসংখ্য ডেটা, কথোপকথন, ভিডিও, অডিও এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধের তথ্য থাকতে পারে। সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে। পর্যালোচনা শেষে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ ও উপাত্ত তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দেওয়া হলে তিনি সে অনুযায়ী তদন্তের পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।

বিজ্ঞাপন

Recommended For You