
বাংলা রিডার ডেস্ক
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন শহীদ ইমনের মা কুলসুম বেগম।
বুধবার (৭ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি তার ছেলে ইমনের মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা দেন। এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার পর স্বজনদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল এবং কান্নাকাটি করলে লাশ গায়েব করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে মেনন ও কামরুল নানা ধরনের উসকানি দেন।
তারা আওয়ামী লীগ সরকার ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ পদে থেকে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং কারফিউ জারির প্ররোচনা দেন। তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রে রাজধানীর বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়।
মেনন ও কামরুলের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বাড্ডাসহ আশপাশের এলাকায় ২৩ জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা দুজনই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
কুলসুম বেগম জবানবন্দিতে বলেন, আমি শহীদ ইমনের মা। ইমনের বয়স ১৪ বছর। সে রিকশা চালাত। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে সে খাওয়াদাওয়া করে বাসা থেকে বের হয়। সঙ্গে তার বন্ধু নাঈম ও শাহীন গিয়েছিল। তারা আন্দোলনে যায় তেঁতুলতলা মোড়ে। আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে আমার ছেলের বন্ধু শাহীন বাসায় এসে আমার বড় ছেলে রাজীবকে বলে যে, ইমন গুলি খেয়েছে।
তিনি বলেন, আমি, আমার স্বামী ও আমার বড় ছেলে রাজীব এম জেড হাসপাতালের সামনে তেঁতুলতলা মোড়ে যাই, যেখানে আমার ছেলে ইমন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। যাওয়ার পথে দেখি চারদিক থেকে গুলি হচ্ছিল। এমনকি ওপরের দিক থেকেও গুলি ছোড়া হচ্ছিল। সেখানে গিয়ে দেখি, আমার ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তার জ্ঞান ছিল না। তাকে এ অবস্থায় দেখে আমিও জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
কুলসুম বেগম আরও বলেন, আমার ছেলেকে তিনজন ব্যক্তি রিকশা করে আমার বাসার সামনের রাস্তায় নিয়ে আসে মর্মে শুনেছি। আমাকেও বাসায় নিয়ে আসা হয়। বাসায় আসার পর আমার জ্ঞান ফিরলে আমি বাসার সামনে ছেলের লাশ দেখতে পাই। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দেখতে পাই, তার মাথার পেছনে গুলিতে ছোট একটি ফোঁটা। বাম গালের চামড়া ইঁদুরের গর্তের মতো হয়ে ঝুলে থাকতে দেখি। বুকের এক পাশে (ডান পাশে না বাম পাশে মনে নেই) গুলির চিহ্ন দেখতে পাই।
তিনি বলেন, তখন লম্বা চুলওয়ালা আওয়ামী লীগের একজন এসে ধমক দিয়ে বলে, লাশ পেয়েছেন, কাঁদতে পারবেন না, না হলে লাশ গায়েব করে দিব।
কুলসুম বেগম আরও বলেন, আমার বড় ছেলে রাজীব একটি মসজিদে খাটিয়ার জন্য গেলে তাকে খাটিয়া দেওয়া হয়নি। অন্য একটি মসজিদে গেলে খাটিয়াসহ গোসল করানোর লোক এসে আমার ছেলেকে গোসল দেয়। তারপর তার জানাজা শেষে রাত ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ছেলের লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিই।
তিনি বলেন, তখনও চারদিক থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছিল। পথিমধ্যে তিন জায়গায় আওয়ামী লীগের লোকজন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন লাশ নিয়ে যেতে বাধা দেয়। আমি অনুরোধ করলে তিন জায়গা থেকেই ছাড়া পাই। ২১ জুলাই সকাল সাড়ে ৮টার দিকে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাই। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে আমার ছেলের লাশ দাফন করা হয়।
এ হত্যার জন্য শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, রাশেদ খান মেনন ও কামরুল ইসলামকে দায়ী করেন কুলসুম বেগম।



