ইসলামই রাজনীতির সুতিকাগার

জাকির মজুমদার :

ইসলামই রাজনীতির সুতিকাগার। মানবজীবনের সকল পর্বই ইসলামে আলোচিত-নির্দেশিত। এমনকি ইসলামে পরিবেশ-প্রতিবেশ বিষয়েও রয়েছে দিক-নির্দেশনা। আর পৃথিবীর প্রথম রাজনৈতিক চুক্তি হলো ‘মদিনা সনদ’। তারপরও অমুসলিমরা তো বটেই, অজ্ঞ মুসলিমরাও ইসলামকে ধর্ম বা কবরজীবন অথবা শুধু পরকালীন বিষয় বলে মনে করে। তারা ইসলাম ও রাজনীতিকে আলাদা করে রাখতে চায়।

রাজনীতি ও ইসলামকে আলাদা করা লোকেরা বাস্তবে শিক্ষিত হলেও এরা আগাগোড়া অজ্ঞ। রাজনীতির জ্ঞান যেমন এদের অপূর্ণ, একইভাবে ক্লাশ গণণা করে সনদ যুগিয়ে সমাজে নিজেকে শিক্ষিত প্রমাণ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এতটুকুই এদের দৌড়।

দেখুন, নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর হাত ধরে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে মদিনা সনদ (মদিনা চ্যাপ্টার) প্রণীত হয়। সভ্য দুনিয়ার সূচনাপর্বে যা প্রথম রাজনৈতিক দলিল হিসেবে চিহ্নিত। একইসঙ্গে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান বা চুক্তি। মদিনায় বসবাসরত বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিলো মদিনা সনদের প্রধান উদ্দেশ্য। বিশেষ করে মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে শান্তি, পারস্পরিক সহাবস্থান, সহযোগিতা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছিল এই চুক্তিতে।

একইভাবে হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল মক্কা ও মদিনার মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পাদিত একটি শান্তি চুক্তি। মদিনা চ্যাপ্টার প্রণিত হওয়ার চার বছরের মাথায় ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে (৬ষ্ঠ হিজরি সালের জিলকদ মাসে) মদিনার মুসলিম এবং মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে কুরাইশরা মুসলিম রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। চুক্তিতে মুসলিমরা ১০ বছরের জন্য যুদ্ধ স্থগিত করতে সম্মত হয়। বিপরীতে মুসলিমরা বিনা বাধায় মক্কা ভ্রমণের সুযোগ পায়। হুদাইবিয়া নামক স্থানে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় এটি হুদায়বিয়া সন্ধি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

এখন বলুন, ইসলাম কি গতানুগতিক ধর্ম পালনের বিষয়? নবী সা. কি শুধু ইসলামের কিছু আনুষ্ঠানিক ধর্ম পালনের বার্তা নিয়ে দুনিয়ায় এসেছেন? নাকি মানবজীবনের সকল পর্বে আল্লাহ তাআলার বিধান, হুকুম তথা ইসলামের শরিয়া বাস্তবায়নের জন্য ওনাকে আল্লাহ প্রেরণ করেছেন। পবিত্র আল-কোরআনে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি নবীকে হেদায়েত ও দ্বীনে হক (ধর্ম, পথনির্দেশ ও সত্য জীবনবিধান, আইন, মতবাদ, আদর্শ) দিয়ে পাঠিয়েছি। যাতে তিনি এই দ্বীনকে অন্য সকল দ্বীনের (আইন, মতবাদ, মতাদর্শের) উপর বিজয়ী করেন। চাই তা মুশরিকদের কাছে যতই অপছন্দ হোক না কেন”(আস-সফ-৯)।

কোরআনে আল্লাহ আরও বলেন, “আর আমি (আল্লাহ) জিন ও মানুষকে কেবলমাত্র আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (আয-যারিয়াত ৫৬)।

সারকথা হলো- মহান আল্লাহ তাআলার উপাসনা-বন্দেগী করার পাশাপাশি তার আইন-বিধানকে অবশ্যই ব্যক্তিজীবনে মানা ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামের দাবি, ঈমানদারের দায়িত্ব। মানে আসমান ও জমিন যার, ইবাদত পাওয়ার উপযুক্তও তিনি এবং আইন-বিধানও চলবে তার। এর মাধ্যমেই পুরোপুরি আল্লাহর দাসত্বকে মেনে নেয়া হয়।

আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “ইসলামই হচ্ছে আল্লাহ মনোনীত একমাত্র দ্বীন-জীবনবিধান“ (আল-কোরআন, আলে-ইমরান ১৯)।

আল্লাহ আরও বলেন, “যারা আল্লাহর দেয়া আইন-বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা (সমাজ-রাষ্ট্র পরিচালনা) করে না, তারা কাফের, জালিম ও ফাসিক” (মায়েদা ৪৪, ৪৫ ও ৪৭)।

“আল-উহদা আল-উমারিয়া” চুক্তি। যা “আল-ক্বাওল আল-মাকবুল” নামেও পরিচিত। দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর নেতৃত্বে ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম বাহিনী জেরুজালেম জয় করার পর খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, উপাসনালয়, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। ইসলামী ইতিহাসে এই চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা মুসলিম-অমুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। যা মুসলিম শাসিত অঞ্চলে অমুসলিমদের শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার সুযোগ লাভ ও দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হয়।

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক বন্দোবস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এর ধারাবাহিকতায় চার খলিফা তথা রাশিদুন খিলাফত, উমাইয়া খিলাফত, আব্বাসীয় খিলাফত, মামলুক আব্বাসীয় খিলাফত এবং উসমানীয় সম্রাজ্য বা খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

১৯২৪ সালে উসমানীয় সম্রাজ্যের বিলুপ্তির মাধ্যমে মুলত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা খেলাফত ব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটে। উল্লেখিত ইসলামি খিলাফত ছাড়াও নূরউদ্দিন জঙ্গির সালতানাত, সেলজুক রাজবংশ এমনকি ভারতীয় উপমহাদেশে মোগল সম্রাজ্য ইসলামী রাষ্ট্র, রাজ্য বা খিলাফত ছিলো। এক কথায় ইসলামী খিলাফতের হাত ধরেই বর্তমান কথিত আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্ম। এসব প্রমাণ করে ইসলাম রাজনীতি থেকে আলাদা নয়।

দুনিয়াতে ইসলাম এসেছে শুধু গতানুগতিক ধর্মগুলোর ন্যায় কিছু ধর্মীয় রীতি বা উপাসনার জন্য নয়। ইসলামী শরিয়ার প্রধান দাবিই হচ্ছে ইসলামি হুকুমাত প্রতিষ্ঠা করা। অথ্যাৎ সমাজ-রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহর আইন-বিধান যথাযথ অনুসরণ করা। এর ব্যত্যয় হওয়ার পরিণাম আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন। যারা তা মানবে না তারা কাফির, জালিম ও ফাসিক (মায়েদা ৪৪, ৪৫, ৪৭)।

এখন যারা ইসলামী শরিয়ায় বিশ্বাস করে না। অথবা যারা ইসলাম পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ বা কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়ন করতে চায় তাদেরক যারা “মৌলবাদী” অপবাদ বা গালিতে ভূষিত করে, কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী আমরা তাদের পরিচয় সহজেই শনাক্ত করেতে পারি।

এখন আমাদের দায়িত্ব হলো- আমরা কি ওইসব লোক, গোষ্ঠীকে অনুসরণ করবো? মুসলিম হয়ে মরবো, নাকি কাফের, জালিম, ফাসিক হয়ে মরবো? সিদ্ধান্ত আমাকে-আপনাকেই নিতে হবে। আল-কোরআনে আল্লাহ বলেন, “হে ইমানদারগণ, তোমরা যথাযথভাবে আল্লাহকে ভয় করো, পরিপূর্ণ মুসলিম না হয়ে যেন তোমাদের মৃত্যু না হয়” (আলে-ইমরান ১০২)।

বিজ্ঞাপন

Recommended For You