
বাংলা রিডার ডেস্ক
প্রায় দুই দশকের মধ্যে টানা দ্বিতীয়বারের মতো এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এক যুগ ধরে যেখানে গড় পাসের হার ৮০ শতাংশের ওপরে ছিল, সেখানে এবার তা নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে।
পাসের হার কমে যাওয়ায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সময় বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চলতি শিক্ষাবর্ষে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ১৫ লাখ আসন খালি থাকতে পারে।
শিক্ষার্থীদের পাসের হারের এমন পরিসংখ্যান বড় প্রভাব ফেলবে একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে। এবছর পাশ করা সব শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও প্রায় ১৫ লাখ আসন খালি থাকবে।
একদিকে প্রতিনিয়ত কলেজের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার্থীদের পাশের হার কমায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মফস্বলের কম উন্নত কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়বে।
এটি তাদের আর্থিক ও শিক্ষার মানের উপর বাড়তি প্রভাব ফেলবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, এবছর একাদশ শ্রেণীতে প্রায় ২৫ লাখ আসন রয়েছে।
ঢাকা বোর্ডের পরিসংখ্যা অনুযায়ী, কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে আসন সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি। বিপরীতে এবছর পরীক্ষা দিতে বসেন ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু এরমধ্যে মাত্র ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। ফলে সবাই ভর্তি হলেও প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ আসন ফাঁকা থাকার কথা রয়েছে।
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের দেওয়া তথ্যমতে, গতবছর এসব আসনের মধ্যে প্রায় ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশ পূরণ হয়েছিল এবং ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ আসন শূন্য ছিল। এবছর এই শূন্য আসনের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাশের এমন নিম্নমুখী হার সরাসরি প্রভাব ফেলবে কলেজগুলোতে। সাধারণত ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির চাপ থাকে। ফলে আসন ফাঁকার বড় প্রভাব পড়বে বেসরকারি, এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান, মফস্বলের প্রতিষ্ঠান এবং মানহীন প্রতিষ্ঠানে।
যেসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি থেকে প্রাপ্ত অর্থে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও বেতন প্রদান করে, শিক্ষার্থী না পেলে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি থেকে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় নিশ্চিত করে। শিক্ষার্থী না পেলে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যয় বহনে হিমশিম খাবে। অন্যদিকে শিক্ষার্থী সংকটের কারণে শিক্ষার মানের উপরও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
বিগত বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার পাশের হার গত এক যুগের তুলনায় তলানিতে নেমেছে। পরীক্ষায় শতভাগ ফেল প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। কমেছে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। একইসাথে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা। ২০১৮ সালে ৭৭.৭৭%, ২০১৯ সালে ৮২.২০%, এবং ২০২১ সালে ৯৩.৫৮% শিক্ষার্থী পাস করেন। ২০২২ সালে ৮৭.৪৪%, ২০২৩ সালে ৮০.৩৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৮৩.০৪% শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করে।
২০২৫ সালে ফলাফলে বড় ধস নামে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৮৩% থেকে কমে ৬৮.৪৫% শিক্ষার্থী পাস করেন। গত বছর মোট ১৯ লাখ ৪ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিলেও পাস করে মাত্র ১৩ লাখ ৩ হাজার শিক্ষার্থী। ২০২৬ সালে এসে এই সংখ্যাটি আরও কমেছে।
শিক্ষার্থীদের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার কারণ হিসেবে নবম ও দশম শ্রেণিতে ভিন্ন সিলেবাস ও কারিকুলামে পড়াশোনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নকল প্রতিরোধে কড়াকড়িতে শিক্ষার্থীদের মনে ভয়ের সঞ্চারকে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে ২০২৫ সালে যে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়েছিল তাদের তুলনায় ২০২৬ সালে ভর্তির ক্ষেত্রে আসন সংখ্যা ১৫ লাখের চেয়ে আরও কিছুসংখ্যক বেশি শূন্য থাকবে।
তিনি বলেন, উচ্চ মাধ্যমিকে আসন প্রায় ২৫ লাখ। সেখান থেকে গত বছর পূরণ হয়েছিল ৫৮.৭%। আর শূন্য ছিল ৪১.৩%। এ বছর পাশের হার আরেকটু কমেছে, সে ক্ষেত্রে আসন সংখ্যা আরেকটু বেশি শূন্য থাকবে।
অনলাইনে আবেদন, জিপিএ এবং শিক্ষার্থীদের পছন্দে ভর্তি
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, গত বছরের ন্যায় এবারও জিপিএ এবং শিক্ষার্থীদের পছন্দের ভিত্তিতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি করানো হবে। খুব শিগগিরই নোটিশ জারি করা হবে। এবারও প্রচলিত নিয়মে জিপিএ ও শিক্ষার্থীর পছন্দের ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ দেওয়া হবে। কোনো ভর্তি পরীক্ষা বা লটারি হবে না।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, এই নিয়মের মধ্যে অনলাইনে শিক্ষার্থীদের ভর্তির আবেদন গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ করা হয়। শিক্ষার্থীরা আবেদন ফি জমা দিয়ে সর্বনিম্ন ৫টি এবং সর্বোচ্চ ১০টি কলেজে ভর্তির পছন্দক্রম দিয়ে আবেদন করতে পারেন। পরে তাদের প্রাপ্ত জিপিএ এবং পছন্দক্রমের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।



