
বাংলা রিডার ডেস্ক
ঢাকার সাভারে ধারাবাহিকভাবে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মশিউর রহমান ওরফে সম্রাটকে গ্রেপ্তারের পর আবারও আলোচনায় এসেছে আলোচিত ‘সিরিয়াল কিলার’ রসু খাঁর নাম। প্রায় ১৭ বছর আগে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন তিনি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রেমের অভিনয় করে ১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিলেন রসু খাঁ। এর মধ্যে চাঁদপুরে এক পোশাকশ্রমিক হত্যার দায়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত, যা পরে হাইকোর্ট বহাল রাখে। তবে সেই ফাঁসির আদেশ এখনো কার্যকর হয়নি। বর্তমানে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির আসামিদের সেলে বন্দি রয়েছেন।
গত রোববার সাভারে ছয়টি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় মশিউর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতে দেওয়া তাঁর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সঙ্গে মিল খুঁজে অনেকের মনে রসু খাঁর স্মৃতি ফিরে আসে।

চাঁদপুরে আলোচিত পারভীন হত্যা মামলায় দুই বছর আগে হাইকোর্ট রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন। একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তাঁর ভাগনে জহিরুল ইসলাম ও সহযোগী মো. ইউনুছের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারিক আদালত ২০১৮ সালের ৬ মার্চ এ রায় দেন।
কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, কিছুদিন আগে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে রসু খাঁকে কাশিমপুরে স্থানান্তর করা হয়। তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন এবং ফাঁসির আসামিদের সেলেই রয়েছেন। তবে এখনো কোনো স্বজন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেননি।
এর আগে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক হালিমা খাতুন জানান, কারাগারের একটি ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের কারণে রসু খাঁসহ তিন আসামিকে সাময়িকভাবে কাশিমপুরে পাঠানো হয়েছে। ভবন নির্মাণ শেষ হলে তাঁদের আবার কুমিল্লায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, রসু খাঁ এবং তাঁর ভাগনেসহ তিনজনের বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর। চাঁদপুর সদর উপজেলার সোবহানপুর গ্রামে ডাকাতিয়া নদীর পাড় থেকে শাহিদা আক্তার (১৯) নামের এক তরুণীর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ওই মামলার তদন্তে ২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর চাঁদপুর সদরের মদনা গ্রামের বাসিন্দা রসু খাঁ মসজিদের ফ্যান চুরির মামলায় গ্রেপ্তার হন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি একের পর এক হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।
পুলিশ জানায়, ২০০৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর খুলনার দৌলতপুরের পোশাকশ্রমিক শাহিদা আক্তারকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে চাঁদপুরে এনে ধর্ষণের পর হত্যা করেন তিনি। এরপর ২০০৯ সালের ২০ জুলাই ফরিদগঞ্জ থানার হাসা খালের পাশে পারভীন নামের এক নারীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার কথাও স্বীকার করেন।
রসু খাঁ পুলিশকে জানিয়েছিলেন, তিনি ফরিদগঞ্জে ছয়জন, চাঁদপুর সদরে চারজন এবং হাইমচরে একজনসহ মোট ১১ নারীকে হত্যা করেছেন। নিহত সবাই ছিলেন ১৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী পোশাকশ্রমিক। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেন, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে তিনি ধারাবাহিক হত্যাকারীতে পরিণত হন এবং তাঁর লক্ষ্য ছিল ১০১ জনকে হত্যা করা।
রসু খাঁর উত্থানও ছিল অপরাধপ্রবণ। চাঁদপুর সদর উপজেলার মদনা গ্রামের খাঁ বাড়ির বাসিন্দা রসু ছোটবেলা থেকেই চুরি ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে গ্রামবাসী তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে তিনি গাজীপুরের টঙ্গীতে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
নিজের জবানিতে রসু খাঁ জানিয়েছিলেন, টঙ্গীতে এক নারী পোশাকশ্রমিকের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে গণপিটুনির শিকার হয়ে তিনি ১০১ নারী হত্যার ‘শপথ’ নেন। তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।


