“আমরা ছিলাম এক জীবন্ত নরকে”: ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্ত ফিলিস্তিনি

বাংলা রিডার ডেস্ক
ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনিরা ফিরেছেন গাজায়। স্বজনদের কাছে ফিরে গিয়ে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। আবেগমথিত পরিবেশে তাঁরা বলছেন—”আমরা কারাগারে নয়, ছিলাম এক কসাইখানায়।”

আল জাজিরা’র বরাতে জানা গেছে, মুক্তিপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনিরা নিজেদের বন্দিজীবনকে বর্ণনা করেছেন ‘মানবসভ্যতার সীমা ছাড়ানো এক নির্মম অভিজ্ঞতা’ হিসেবে। ঘুমানোর তোশক ছিল না, খাবার ছিল অপ্রতুল, নির্যাতন ছিল প্রতিদিনের রুটিন।

আবদাল্লাহ আবু রাফি, সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত একজন ফিলিস্তিনি বলেন, “আমরা ছিলাম না কোনো জেলে, ছিলাম এক কসাইখানায়—যার নাম ওফের কারাগার। সেখানে তোশক নেই, খাবার নেই, শুধু নিপীড়ন আর যন্ত্রণা। প্রতিদিন একটি নতুন নির্যাতন।”

ইয়াসিন আবু আমরা নামের আরেকজন বন্দি বলেন, “চার দিন টানা কিছু খেতে পারিনি। মুক্তির পর যখন আমাকে দুটি মিষ্টি দেওয়া হয়, সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে ফেলি। এটা ছিল নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত রূপ।”

সাঈদ শুবাইর বলেন, “এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। কারাগারের লোহার গরাদের ফাঁক দিয়ে সূর্য দেখা, শিকলমুক্ত হাত—এই স্বাধীনতা অমূল্য।”

সাংবাদিক ইব্রাহিম আল-খালিলি’র ভাই মোহাম্মদ আল-খালিলি বলেন, “আমাকে মারধর করা হয়েছে, অপমান করা হয়েছে। ১৯ মাস ধরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই আটকে রেখেছিল। এটা ছিল এক ভয়ংকর সংগ্রাম।”

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এই ধরনের অভিযোগহীন আটকাদেশকে ‘অবৈধ প্রশাসনিক আটক’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইয়াসির আবু তুরকি বলেন, “এই অনুভূতিকে একসাথে ব্যথা, আনন্দ আর বিস্ময়ের মিশ্রণে বোঝানো যায়। এটা যেন নরক থেকে স্বর্গে ফিরে আসা।”

১৯ বছর পর মুক্তি পেলেন ফিলিস্তিনি সাহিত্যিক বাসিম খানদাকজি। তেলআবিবে ২০০৪ সালের এক বোমা হামলার ঘটনায় গ্রেফতার হন মাত্র ২১ বছর বয়সে। তিনটি মামলায় আজীবন সাজা দেওয়া হয় তাঁকে।

কারাগারে থেকেও থামেননি লেখালেখি। তাঁর লেখা উপন্যাস “A Mask, the Color of the Sky” ২০২৪ সালে জিতে নেয় আন্তর্জাতিক আরবি সাহিত্য পুরস্কার।

তবে মুক্তি পেলেও তিনি ফিরতে পারেননি নিজ মাতৃভূমি ফিলিস্তিনে। ইসরায়েল তাঁকে নির্বাসিত করেছে মিসরে।

ইসরায়েলের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন ৫৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী, যাদের মধ্যে ২৪ জন নার্স, ৭ জন চিকিৎসক এবং ২ জন প্যারামেডিক।

মানবাধিকার সংস্থা Healthcare Workers Watch জানিয়েছে, এদের মধ্যে অন্তত ৪৪ জনকে হাসপাতাল থেকে অপহরণ করা হয়, যখন তাঁরা কর্তব্যরত ছিলেন।

সংস্থাটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ডা. মুয়াথ আলসের বলেন, “স্বাস্থ্যকর্মীদের অপহরণ এক ধরনের যুদ্ধাপরাধ। এতে শুধু চিকিৎসকরা নয়, গোটা জনগণই চিকিৎসা সেবার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।”

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, “সব স্বাস্থ্যকর্মীকে অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে মুক্তি দিতে হবে। যারা বন্দিদশায় প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের মরদেহও ফিরিয়ে দিতে হবে।”

আল জাজিরা জানিয়েছে, ইসরায়েল প্রায় ২৫০ জন আজীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিকে এবং গাজা যুদ্ধ চলাকালে আটক ১,৭১৮ জনকে মুক্তি দিয়েছে।

জাতিসংঘ এই বন্দিদের ‘জোরপূর্বক নিখোঁজ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

বিজ্ঞাপন

Recommended For You