
বাংলা রিডার ডেস্ক
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান দমন করতে সারাদেশে পুলিশ প্রায় ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলি ছুঁড়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরেই ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড গুলি ব্যবহার করা হয়।
সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক কার্যক্রমে এ তথ্য উপস্থাপন করেন মামলার ৫৪তম সাক্ষী ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া ২১৫ পৃষ্ঠার একটি গোপন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসব পরিসংখ্যান তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকায় সর্বোচ্চ গুলি, সারাদেশে প্রাণঘাতী হামলা
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আন্দোলন দমনে শুধু ঢাকায় ব্যবহার করা হয়েছে এলএমজি, এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল, শটগান, রিভলবার, পিস্তলসহ বিভিন্ন মারণাস্ত্র। গুলির সংখ্যা ছিল ৯৫,৩১৩ রাউন্ড। সারাদেশে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ৫ হাজার ৩১১ রাউন্ডে।
এছাড়া, র্যাব সদর দপ্তর থেকে হেলিকপ্টার ব্যবহারের তথ্য-প্রমাণও সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা।
বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, ও শ্মশান থেকে প্রমাণ সংগ্রহ
তিনি বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিহত ও আহতদের বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জব্দ করা হয়েছে।
এছাড়া, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতাল, নিটোর ও জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে আহতদের চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য ও সনদ সংগ্রহ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৮১টি অজ্ঞাত লাশের ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল রিপোর্ট জব্দ করা হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ
তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীর আরও বলেন, শেখ হাসিনা, কামাল ও মামুনের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও প্ররোচনায়: দেড় হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা বা হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে । হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে জখম, অঙ্গহানি, বেআইনি আটক, নির্যাতন ও অপহরণ করা হয়। মৃতদেহ শনাক্তের সুযোগ না দিয়ে বেওয়ারিশ ঘোষণা করে তড়িঘড়ি করে দাফন করা হয়। আন্দোলনকারী ছাত্রীদের যৌন নিপীড়ন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে জীবিত বা মৃত দেহ একত্র করে আগুনে পোড়ানো হয়েছে। মিথ্যা মামলা, চিকিৎসা, দাফন ও শেষকৃত্যেও বাধা দেওয়া হয়েছে। এমনকি মৃত্যুর কারণ পাল্টে দিতে চিকিৎসকদের বাধ্য করা হয়েছে।
ফোনালাপ ও ভিডিও ফুটেজসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত
তদন্তে পাওয়া ৬৯টি অডিও ক্লিপ, বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য, ও বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আলোচিত চারটি ফোনালাপে শেখ হাসিনাকে কথা বলতে শোনা গেছে: শেখ ফজলে নূর তাপস (তার আত্মীয় ও সাবেক মেয়র), হাসানুল হক ইনু (জাসদের সভাপতি) – ২টি কল, এএসএম মাকসুদ কামাল (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য)।
এসব কলের মধ্যে কিছু ট্রাইব্যুনালের খোলামেলা শুনানিতে বাজিয়ে শোনানো হয়েছে এবং সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে।
আসামিদের অবস্থা ও মামলার অগ্রগতি
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক, সাবেক আইজিপি চৌধুরী মামুন আদালতের সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে নিজেকে ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) হিসেবে আবেদন করেন, যা আদালত মঞ্জুর করেছে।
মামলার তদন্ত প্রতিবেদন গত ১২ মে দাখিল করা হয় এবং ৩১ মে সম্পূরক অভিযোগ, এরপর ১ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। ১০ জুলাই ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন।
এ মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন উপ-পরিচালক মো. জানে আলম খান, যিনি পরে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন মো. আলমগীরের কাছে। মামলায় বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা সার্বিক সহযোগিতা করেন।
এই মামলায় এখন পর্যন্ত ৫৪ জন সাক্ষীর মধ্যে সবশেষ সাক্ষী হিসেবে মো. আলমগীর জবানবন্দি দিয়েছেন, যা মামলার বিচারিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছে।


