
বাংলা রিডার ডেস্ক
২৫ মে, আসামের নলবাড়ি জেলার বরকুরা গ্রাম থেকে পুলিশ ডেকে নিয়ে গিয়েছিল ৬৫ বছর বয়সী সাকিনা বেগমকে। বলা হয়েছিল, থানায় শুধু একটি সই করাতে হবে, এরপরই তাকে বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সেই দিন থেকেই নিখোঁজ হয়ে যান সাকিনা বেগম। চার মাস পর, অবশেষে তার খোঁজ মিলল ঢাকার মিরপুরে।
‘সই’ করানোর নামে নিখোঁজ
সাকিনা বেগম ছিলেন ভারতের আসাম রাজ্যের নলবাড়ি জেলার বাসিন্দা। মে মাসে, পুলিশ তাকে বরকুরা গ্রাম থেকে নিয়ে যায়। সেই সময় এমন আরও বহু মানুষকে, যাদের ‘ঘোষিত বিদেশি’ বলা হয়েছে, সই করানোর অজুহাতে থানায় ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে জানা যায়, তাদের অনেককেই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। কারও জায়গা হয় ডিটেনশন ক্যাম্পে, আবার অনেকেই পুরোপুরি নিখোঁজ হয়ে যান — যাদের মধ্যে একজন ছিলেন সাকিনা বেগম।
মিরপুরে সাকিনা বেগম
বিবিসি জানতে পারে, ঢাকার মিরপুরে এক বৃদ্ধা আশ্রয় নিয়েছেন যিনি নিজেকে আসামের বাসিন্দা বলে দাবি করছেন। তিনি বারবার ‘নলবাড়ি’ নামটি বলছিলেন। গুগল ম্যাপের মাধ্যমে দেখা যায়, ভারতের আসামে নলবাড়ি নামে একটি জেলা এবং সেখানে বরকুরা নামের একটি গ্রামও রয়েছে।
বিবিসি এরপর স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত হয়, হ্যাঁ — সাকিনা বেগম নামে একজন বৃদ্ধাকে সেখান থেকে পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল এবং তার পর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
ছবি দেখে মাকে চিনে ফেলল সন্তানরা
পরিচয় যাচাইয়ের জন্য সাকিনা বেগমের পরিবারের কাছ থেকে তার পুরনো ছবি জোগাড় করা হয়। অন্যদিকে, ঢাকায় সাকিনা বেগমের সর্বশেষ ছবি তুলেছিলেন বিবিসির প্রতিনিধি। দুই ছবি মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় — দুই দেশের দুই প্রান্তে থাকা নারীটি একই।
এরপর তার বড় মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ভিডিও কলে মুখোমুখি হন মা ও সন্তানরা। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই সাকিনা বেগম বলে ওঠেন, “এই তো আমার মেয়ে…”। সন্তানদের চোখে জল, মায়ের কণ্ঠে আকুলতা।
কীভাবে এলেন বাংলাদেশে?
সাকিনা বেগম জানান, থানায় নিয়ে যাওয়ার নাম করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তারকাঁটার বেড়ার মধ্যে দিয়ে এক গেটের সামনে নিয়ে গিয়ে বলা হয়, “ধীরে ধীরে চলে যাও, শব্দ কোরো না”। ওই জায়গা যে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত, তা তার জানা ছিল না।
সেখানে থেকে একা একাই পথে নেমে পড়েন তিনি। রাতে একটি বাসে উঠে পড়েন। কিন্তু ভাষাগত সমস্যা আর দিক না চেনায়, বাস থেকে বারবার নামিয়ে দেওয়া হয় তাকে। একাধিক বাস বদলে শেষে ঢাকার মিরপুরে এসে পৌঁছান তিনি। কান্নারত অবস্থায় তাকে দেখতে পান এলাকার কিছু মানুষ এবং আশ্রয় দেন স্থানীয় এক পরিবার।
মিরপুরের পরিবার যা জানায়
আশ্রয়দাতা পরিবারটির সদস্য ক্লান্তি আখতার জানান, বৃদ্ধার মুখের ভাষা তারা বুঝতে পারতেন না। কিন্তু বারবার ‘নলবাড়ি’ বলার মাধ্যমে তারা আঁচ করতে পারেন, তিনি ভারতের কেউ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, অসমীয়ায় তার বলা কথাগুলো থেকে তারা বোঝেন, এই নারীকে ‘পুশ-ইন’ করা হয়েছে — অর্থাৎ জোর করে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আসামে পরিবার কী বলছে?
সাকিনা বেগমের মেয়ে রাসিয়া বেগম জানান, ২৫ মে তারিখে পুলিশ তাকে এসপি অফিসে সই করানোর জন্য ডাকে। এরপর বলা হয় তাকে গোয়ালপাড়ার ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, তার কোনো খোঁজ নেই। তিনবার খোঁজ নিতে গিয়েও ব্যর্থ হন তারা।
রাসিয়া বলেন, “আমার মা বেঁচে আছে না মরে গেছে, কিছুই জানি না। খুঁজতেও পারি না, সেই সামর্থ্য আমাদের নেই।”
‘ঘোষিত বিদেশি’ হিসেবে তকমা
সরকারি নথি অনুসারে, সাকিনা বেগমকে আসামের বিদেশি ট্রাইব্যুনাল ‘বিদেশি নাগরিক’ ঘোষণা করেছিল। পরে সেই রায় বহাল রাখে গৌহাটি হাইকোর্টও। করোনা সময়কালে তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং নিয়মিত থানায় হাজিরা দিচ্ছিলেন। এরপর হঠাৎই উধাও হয়ে যান তিনি।
আসামে পুশ-ব্যাকের অভিযোগ
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বহু আসামি মুসলিম — যাদের পূর্বপুরুষরা শত বছর ধরে ভারতে বসবাস করছেন — তাদের শুধু কাগজপত্রে সামান্য ত্রুটির কারণে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। একাধিক জনস্বার্থ মামলাও চলছে এ নিয়ে।
বিশেষ করে মে মাসে শুরু হওয়া অভিযানে এমন অনেক মানুষকে টার্গেট করা হয়, যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই ‘বিদেশি’ ঘোষণা ছিল।
সাকিনা বেগমের ভবিষ্যৎ কী?
সাকিনা বেগম এখন আশ্রয়দাতা পরিবারের সাথেই আছেন ঢাকায়। তার সন্তানরা আকুতি জানাচ্ছেন — “আমাদের মাকে ফিরিয়ে দিন”।
স্থানীয় ভাষানটেক থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি তারা তদন্ত করছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই মানবিক ঘটনা শুধু এক ব্যক্তির নয়, বরং সীমান্তের দুই প্রান্তে থাকা হাজারো নিরীহ মানুষের করুণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সাকিনা বেগমের মতো আরও কতজন এখনো নিখোঁজ তার হিসাব নেই কারও কাছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা


