
বাংলা রিডার ডেস্ক
দীর্ঘ বিরতির পর আবারও পদ্মা, মেঘনা আর কীর্তনখোলার বুক চিরে ছুটে চলবে ইতিহাসের সাক্ষী, সময়ের অনন্য বাহন—প্যাডেল স্টিমার। রাজধানী ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে ছুটে চলবে বরিশাল ও দক্ষিণ উপকূলের নদীপথে। সেই পুরনো স্মৃতি আবার ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানালেন, সবকিছু ঠিক থাকলে অক্টোবরে তিনি নিজেই স্টিমারে চেপে যাবেন বরিশাল। আর সেই স্টিমার ১০৮৯ দিন ধরে পড়ে ছিল থেমে।
এক সময় ঢাকা-বরিশাল-খুলনা রুটে জীবনের গতি ছিল এই স্টিমারেই। নদীপথ ছিল তখন উপকূলের মানুষের একমাত্র ভরসা। প্যাডেল ঘুরিয়ে পানি ঠেলে এগিয়ে যাওয়া এই বিশাল জাহাজগুলো ছিল নির্ভরতার প্রতীক। ঝড়-জলোচ্ছ্বাস যাই আসুক, প্যাডেল স্টিমার এগিয়ে গিয়েছে সাহসিকতার সাথে। দেড় শতাব্দীর বেশি সময়েও দুর্ঘটনাহীন এই যানের গল্প যেন জলপথের কিংবদন্তি।

বরিশালের প্রবীণ সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ নাসিম উল আলম জানান, ১৮৮৭ সালে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার তীর থেকে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। পরে রাজধানী ঢাকার বাদামতলী ঘাট হয়ে খুলনা, বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে ছুটে চলেছে এসব স্টিমার। তখনকার ব্রিটিশ কোম্পানি আই.জে.এন.আর.এস আনে কয়লাচালিত এই স্টিমার। আর ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এগুলোকে ডিজেলচালিত রূপে পুনরুজ্জীবিত করেন।
বাহিনীতে এক সময় ছিল ছয়টি স্টিমার: পিএস গাজী, পিএস মাহ্সুদ, পিএস কিউই, পিএস লেপচা, পিএস টার্ন, পিএস অস্ট্রিচ ।
এর মধ্যে পিএস গাজী ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়—দ্রুতগামী ও নির্ভরযোগ্য। তবে ১৯৯৮ সালে ঢাকায় মেরামতের সময় আগুনে পুড়ে সেটি হারিয়ে যায়। এখন পিএস অস্ট্রিচ একটি ভাসমান রেস্তোরাঁ হিসেবে ব্যবহৃত হয়—দেশি-বিদেশি অতিথিদের নৌবিহারে এটি অনন্য।
২০২২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর যাত্রী সংকট দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় এই স্টিমার সার্ভিস। এক সময় যা ছিল ঢাকা-খুলনা রুটে চলমান, তা শেষ দিকে নেমে আসে কেবল মোরেলগঞ্জ পর্যন্ত। যাত্রী সেবার মান, সময়ক্ষেপণ আর নাব্য সংকট মানুষের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। ঝালকাঠির বশিরুল ইসলাম বললেন, “যাত্রা যেমন দীর্ঘ হতো, সেবাও ছিল নিম্নমানের। তাই মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়।”
তবে এখনো অনেকের কাছে স্টিমার মানেই নিরাপদ যাত্রা। কাউখালীর আহসান মুন্সির কথায়, “যদি সময়মতো চলে আর সেবার মান বাড়ানো যায়, তাহলে আজও স্টিমারের তুলনা নেই।”
বিআইডব্লিউটিসির বরিশাল দপ্তরের কর্মকর্তা জুয়েল কুমার দাস জানালেন, বর্তমানে ৪টি চলাচল উপযোগী স্টিমার রয়েছে: পিএস অস্ট্রিচ, পিএস মাহ্সুদ, পিএস লেপচা, পিএস টার্ন ।
প্রথম ধাপে অস্ট্রিচ ও মাহ্সুদ প্রস্তুত করা হচ্ছে চালুর জন্য। যাত্রী চাহিদা বাড়লে বাকিগুলোকেও নামানো হবে নদীতে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে মাত্র এক মাসের মধ্যেই নদীর বুকে রাজহংসের মতো ফিরে আসবে এই শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী স্টিমার।
সময়ের বাঁকে হারিয়ে যাওয়া একটি অধ্যায় আবার ফিরছে পদ্মা-মেঘনার ঢেউয়ে। প্রযুক্তি ও গতির এই যুগে এক টুকরো অতীতকে ফিরিয়ে আনার এই প্রয়াস শুধু নস্টালজিয়া নয়, বরং ঐতিহ্যকে সম্মান জানানো। নদীপথে আরেকবার যাত্রা শুরু হবে—ঢেউয়ে ঢেউয়ে লেখা হবে নতুন গল্প।



