
বাংলা রিডার ডেস্ক
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে চাঁদপুরের ৩১ জন শহীদ হন। এক বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁদের স্বজনদের বেদনা কমেনি। সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহায়তা পেলেও পরিবারের সদস্যদের একটাই দাবি—প্রিয়জন হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
চাঁদপুরের কচুয়া, হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের শহীদ পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩১ জনের মধ্যে একজন কুমিল্লায়, দুজন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ ও ফরিদগঞ্জে এবং বাকিরা ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় নিহত হন। মতলব উত্তরের পারভেজ ব্যাপারী ছাড়া অন্য সবার মরদেহ শনাক্ত করে নিজ নিজ এলাকায় দাফন করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে ফরিদগঞ্জে শহীদ হন বালিথুবা ইউনিয়নের শাহাদাত। একই দিন কুমিল্লার মোগলটলি এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন হাজীগঞ্জের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ আগস্ট তিনি মারা যান। এছাড়া ৪ আগস্ট হাজীগঞ্জ পৌরসভার টোরাগড় এলাকার বাসিন্দা আজাদ সরকার হামলার শিকার হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
প্রথম দিকে সহায়তা পায়নি অধিকাংশ পরিবার
আন্দোলনের সময় নিহত হলেও ৫ আগস্টের আগে অধিকাংশ শহীদ পরিবার কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পায়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সামনে আসে তাঁদের মৃত্যুর ঘটনাগুলো এবং পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার চিত্র।
তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিনের সময় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তথ্য যাচাই শেষে শহীদ পরিবারের বাড়িতে কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়। সাংবাদিকদের অনুরোধে প্রত্যেক পরিবারকে ১০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা ও ফল দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেও আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়।
তবে স্বজনদের ভাষ্য, আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল এবং এখনো আছে, কিন্তু বিচার ছাড়া সেই ক্ষত কখনো পূরণ হবে না।
মাথায় গুলি লেগে শহীদ হন আব্দুল কাদির মানিক
ফরিদগঞ্জ উপজেলার পূর্ব মানিকরাজ গ্রামের আব্দুল কাদির মানিক (৪৩) রাজধানীর উত্তরায় আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। পরিবারের দাবি, গুলিতে তাঁর মাথার একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্থানীয়দের সহযোগিতায় মরদেহ গ্রামের বাড়িতে এনে দাফন করা হয়।
স্ত্রী রাহিমা জানান, স্বামী নিহত হওয়ার পর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তা পেয়েছেন। জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে পাঁচ লাখ টাকা, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা এবং পরে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি বলেন, সহায়তা মিললেও এখন আর কেউ তাঁদের খোঁজ নেন না। তাঁর একমাত্র দাবি, স্বামী হত্যার বিচার।
বিজয় মিছিলে গিয়ে প্রাণ হারান আমির
ফরিদগঞ্জ উপজেলার বড়গাঁও গ্রামের আমির হোসেন (৩২) রাজধানীর উত্তরায় একটি প্রতিষ্ঠানে গাড়িচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বিজয় মিছিলে অংশ নিতে গিয়ে বুকে ও গলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
আমিরের বাবা-মা বলেন, তাঁদের ছেলেকে যারা হত্যা করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
সন্তানের মরদেহও দেখতে পারেননি পারভেজের মা
মতলব উত্তর উপজেলার বারহাতিয়া গ্রামের পারভেজ ব্যাপারী (২৩) ১৯ জুলাই রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় তাঁর মরদেহ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে ঢাকার গণকবরস্থানে দাফন করা হয়। ফলে মা শামছুন্নাহার শেষবারের মতো ছেলের মুখও দেখতে পারেননি।
তিনি বলেন, ছেলে শহীদ হলেও শেষবার নিজের হাতে ছুঁয়ে দেখতে না পারার কষ্ট আজও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। পরিবারের দাবি, সন্তানের হত্যার বিচার দেখতে চান তাঁরা।
নামাজ শেষে মিছিলে গিয়ে আর ফেরেননি সাব্বির
চাঁদপুর শহরের রঘুনাথপুর গ্রামের হাফেজ সাজ্জাদ হোসেন সাব্বির (১৯) ১৯ জুলাই রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় আসরের নামাজ আদায় করে আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেন। পরিবারের ভাষ্য, সেখানে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।
সাব্বিরের মা শাহনাজ বেগম এখনো সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর পরিবারেরও একমাত্র প্রত্যাশা, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা।
বিচারই এখন শহীদ পরিবারের প্রধান দাবি
চাঁদপুরের শহীদ পরিবারগুলোর অনেকে নগদ অর্থ, সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন ধরনের সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা পেয়েছেন। এসব সহযোগিতা তাঁদের কঠিন সময়ে কিছুটা স্বস্তি দিলেও প্রিয়জন হারানোর শূন্যতা পূরণ হয়নি।
স্বজনদের ভাষ্য, আন্দোলনে নিহত প্রত্যেকের মৃত্যুর ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে গুলি, হামলা ও হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।



