
বাংলা রিডার ডেস্ক
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে টানা ৫৪ বছর ধরে নারীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন না। ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক প্রথার কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম হিন্দু-মুসলিম নারী ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৯ সালে ভারতের জৈনপুর থেকে আগত পীর মওদুদল হাসান কলেরা মহামারির সময় নারীদের পর্দা মেনে চলা এবং ভোটকেন্দ্রে নারীদের না গেলে হয় না এমন কথা বলেন। সে সময় পীর সাহেবের ওই কথা শুনার ফলে মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে—এমন বিশ্বাস থেকেই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের নারীরা আজও ভোট প্রদান থেকে বিরত রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রতিবছর সচেতনতামূলক সভা-সমাবেশ ও প্রচারণা চালানো হলেও দীর্ঘদিন ধরে নারীদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে তারা কার্যত তাদের সাংবিধানিক অধিকার ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
স্থানীয়ভাবে দেখা যায়, ভোট না দিলেও নারীরা নিয়মিত বাজার-হাটসহ দৈনন্দিন কাজে বাইরে যাচ্ছেন। শিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তারা পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে অংশ নিচ্ছেন এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করছেন। তবে ভোটের ক্ষেত্রে এখনো এক ধরনের ভয় ও সামাজিক প্রথাগত বাধা কাজ করছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দীর্ঘদিনের প্রথা ভাঙতে উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন ও ইউনিয়ন পরিষদ। নারীদের ভোটকেন্দ্রে আনতে আলাদা সচেতনতামূলক কর্মসূচি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা এবং নিরাপত্তা জোরদারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এই সামাজিক বাস্তবতা পরিবর্তন করে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা যাবে কি না, সেদিকেই নজর প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের।
স্থানীয় নারী ভোটার রুজিনা আক্তার বলেন, “আমাদের পরিবারের কোনো নারী কখনো ভোট দেয়নি। হুজুর ভোট দিতে নিষেধ করেছিলেন, তাই আমরা তার কথা মেনে চলছি। ভবিষ্যতে মানুষের মন বদলালে নারীরাও ভোট দিতে পারে।”
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদে আসা আফরোজা বলেন, “আমাদের গ্রামের নারীরা কেউ ভোটকেন্দ্রে যায় না। সবাই জৈনপুর হুজুরের কথা মানে। বাজারে আসা-যাওয়ায় কোনো বাধা নেই, কারণ সেগুলোতে নিষেধ ছিল না।”
স্থানীয় ভোটার রফিকুল ইসলাম জানান, ইউনিয়নের সব ধরনের নির্বাচনে নারীরা সাধারণত ভোট দেন না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু রাজনৈতিক দলের নারী নেতাকর্মী ভোটকেন্দ্রে এলেও অনেকে ভোট প্রদান করেন না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক সভা হলেও তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি জানান।
রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মহসিন হাসান বলেন, নারী ভোটারদের উপস্থিতি বাড়াতে স্কুল-কলেজে ও বাড়ি বাড়ি উঠান বৈঠক করা হয়েছে। আগের তুলনায় সচেতনতা বাড়লেও এখনো প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে নারীরা ভোটাধিকার প্রয়োগে এগিয়ে আসবেন।
চাঁদপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান খলিফা বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি জানতে পেরে নারী ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনতে একাধিকবার চেষ্টা করা হয়েছে, তবে তা ফলপ্রসূ হয়নি। এখনো নারীদের ভোট প্রদানে উদ্বুদ্ধ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল ইসলাম সরকার বলেন, বিষয়টি জানার পর তিনি বিস্মিত হয়েছেন এবং দ্রুত ওই ইউনিয়নে গিয়ে নারীদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ভোট দেওয়া একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। নারীদের সচেতন করে ভোটকেন্দ্রে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হবে।



