চাঁদপুর মুক্ত দিবস আজ

বাংলা রিডার ডেস্ক

আজ ৮ ডিসেম্বর—চাঁদপুর হানাদারমুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনীর দখলমুক্ত হয় পুরো চাঁদপুর জেলা। ভারতের মাউন্টেন ব্রিগেড ও ইস্টার্ন সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের যৌথ অভিযানে ৩৬ ঘণ্টার ভয়াবহ যুদ্ধের পর ৮ ডিসেম্বর চাঁদপুর স্বাধীনতার স্বাদ পায়।

চাঁদপুর থানার সামনে প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন বিএলএফ বাহিনীর প্রধান মরহুম রবিউল আউয়াল কিরণ।

১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল চাঁদপুরে পাকিস্তানি বাহিনী প্রথম আক্রমণ চালায় দুটি বিমান থেকে সেলিং করে। সেদিনই পুরান বাজার এলাকায় এক নারী পথচারী নিহত হন। পরদিন বিকেলে প্রায় পাঁচ শতাধিক পাকসেনা চাঁদপুরে এসে শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরের কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ে সাময়িক ক্যাম্প স্থাপন করে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্টহাউস ছিল তাদের অফিসারদের অবস্থান কেন্দ্র।

এক বৃদ্ধা লতুফা বেগম প্রতিদিনের মতো পশুপাখি নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় স্কুল মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে প্রথম অপারেশনের অংশ হিসেবে হানাদাররা তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং তার গরু-ছাগল জোরপূর্বক নিয়ে যায়। প্রতিবেশী তাফাজ্জল মিজি জানান, চোখের সামনে এই হত্যা ঘটলেও ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে কেউ কাছে যেতে পারেনি।

৮ এপ্রিল রাতেই ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্নভাবে পাক বাহিনীর ক্যাম্পে পাল্টা আক্রমণ চালান। আতঙ্কিত হানাদাররা নির্বিচারে গুলি ছোড়ে, এতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। ৯ এপ্রিল ভোরে শহরে প্রবেশ করে পাকিস্তানি সেনারা চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ডে ইসমাইল হোসেন ভলন্টিয়ারকে হত্যা করে এবং হাসান আলী হাই স্কুল মোড়ে সাইকেলে থাকা আপাক ও মাখন নামে দুই যুবককে গুলি করে হত্যা করে।

এরপর তারা বড় স্টেশন মোলহেড এলাকায় নির্মাণ করে নির্মম টর্চার সেল। রেল, সড়ক ও নৌপথে যেসব যাত্রীকে সন্দেহজনক মনে হতো, তাদের ধরে এনে নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণের শিকার হতে হতো। পরে মরদেহগুলো মেঘনা ও পদ্মায় ভাসিয়ে দেওয়া হতো—নদী আজও সেই অমানবিকতার নীরব সাক্ষী।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে ২০১৩ সালে বড় স্টেশনে ‘রক্তধারা’ নামে বধ্যভূমি নির্মাণ করা হয়। তার আগে ট্রাক রোডে সুশীল, সংকর ও খালেক নামে প্রথম শহীদ তিন মুক্তিযোদ্ধার স্মরণে ‘মুক্তিসৌধ’ স্থাপিত হয় এবং শহরের লেকে নির্মিত হয় ভাসমান স্মৃতিস্তম্ভ ‘অঙ্গীকার’। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে শহীদদের নামের একটি স্মৃতি ফলকও স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি পৌরসভার উদ্যোগে পাঁচ রাস্তার মোড়ে নির্মিত হয়েছে ‘শপথ চত্বর’।

এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াই মাঝে মাঝে তীব্র রূপ নেয়। এরপর শান্তিবাহিনী গঠিত হলে নতুন কায়দায় বাড়তে থাকে অত্যাচার। ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের হত্যাযজ্ঞের সঠিক সংখ্যা আজও নিশ্চিত নয়।

চাঁদপুরে সর্বশেষ বড় যুদ্ধ হয় ৭ ডিসেম্বর, যখন লাকসাম ও মুদাফ্ফরগঞ্জ মুক্ত হওয়ার পর যৌথ বাহিনী হাজীগঞ্জ হয়ে এগোতে থাকে। ভারতীয় গার্ডস রেজিমেন্টের নেতৃত্বে ৩১১তম মাউন্টেন ব্রিগেড ও ইস্টার্ন সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা চূড়ান্ত আক্রমণ চালান। পালানোর চেষ্টা করে পাকিস্তানের ৩৯ অস্থায়ী ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল রহিম খানসহ সেনারা দুইটি জাহাজে চড়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলে মুক্তিবাহিনী, মিত্রবাহিনীর ট্যাংক ও বিমান আক্রমণে মেঘনার বুকে তাদের সমাধি ঘটে।

বিজ্ঞাপন

Recommended For You