যুদ্ধের বিভীষিকায় চার মাস, দেশে ফিরলেন বাংলাদেশি জাহাজের ৩১ নাবিক

বাংলা রিডার ডেস্ক
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, চারদিকে যুদ্ধের আতঙ্ক এবং নেভিগেশন ব্যবস্থা বিকল—এমন চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রায় চার মাস পারস্য উপসাগরে আটকে ছিলেন বাংলাদেশি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইসলাম ও তার নেতৃত্বাধীন ৩১ জন নাবিক।

যুদ্ধ চলাকালে তাদের জাহাজের মাত্র ২০০ মিটার দূরে তেলের সংরক্ষণাগারে আগুন ধরে যায়। প্রাণসংকটের মধ্যেও তারা প্রায় চার কোটি ডলার মূল্যের জাহাজ এবং ৮২ লাখ ডলার মূল্যের পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

অবশেষে দেশে ফিরে সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তিনি। বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ৫১ বছর বয়সী এই নাবিক বলেন, ‘আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করেছি। কারণ ৩১টি প্রাণ, চার কোটি ডলারের জাহাজ এবং ৮২ লাখ ডলারের পণ্যের দায়িত্ব আমার ওপর ছিল।’

যুদ্ধ শুরুর আগেই পৌঁছেছিল জাহাজ
মোহাম্মদ ইসলাম ছিলেন ‘বাংলার জয়যাত্রা’ নামে একটি বাল্ক ক্যারিয়ারের ক্যাপ্টেন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরুর প্রায় এক মাস আগে উপসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছায় জাহাজটি।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের চার্টারে পরিচালিত ‘বাংলার জয়যাত্রা’ প্রায় চার মাস যুদ্ধের কারণে আটকে ছিল।

কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরের বাইরের অংশে পৌঁছায় জাহাজটি। সেখানেই যুদ্ধের আবহ টের পান ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইসলাম।

২০০ মিটার দূরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ ভোরে জাহাজ থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে একটি তেল সংরক্ষণাগারে বিধ্বংসী আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্র। মুহূর্তেই আগুনে পুড়ে যায় পুরো স্থাপনা।

নাবিকেরা আতঙ্ক নিয়ে দেখছিলেন, টাগবোটগুলো কীভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

এ সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সবাইকে জাহাজ ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে—এই আশায় জাহাজেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ক্যাপ্টেন।

বন্ধ হয়ে যায় নেভিগেশন ব্যবস্থা
পরবর্তী কয়েকদিনে বারবার বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে চারপাশ। একপর্যায়ে জাহাজের নেভিগেশন ব্যবস্থাও বিকল হয়ে যায়।

তখন বহু বছর পর আবারও হাতে-কলমে জাহাজ চালাতে হয় ক্যাপ্টেন ইসলামকে। তিনি বলেন, বাতিঘর দেখে দেখে পথ নির্ধারণ করতে হয়েছে, যাতে জাহাজ সঠিক পথে থাকে।

কোরআন তিলাওয়াত, টিকটক আর রেশনিং
হরমুজ প্রণালি দিয়ে পূর্ব দিকে যাওয়ার নির্দেশ পেলেও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জাহাজটিকে এগোতে দেয়নি। বারবার চেষ্টা করেও একই পরিণতি দেখতে হয়।

একসময় জাহাজে বিশুদ্ধ পানির মজুত কমে আসে। খাবারও সংকটের মুখে পড়ে। তখন রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেন ক্যাপ্টেন ইসলাম।

তিনি বলেন, অনেক নাবিক ছিলেন প্রথমবারের মতো সমুদ্রে আসা তরুণ। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। কেউ সারাদিন কোরআন তিলাওয়াত করতেন। কেউ সময় কাটাতেন টিকটক দেখে।

অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস
এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও একবার হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয় ‘বাংলার জয়যাত্রা’। অবশেষে ২৩ জুন জাহাজটি প্রণালি অতিক্রমের অনুমতি পায়।

হরমুজ পার হওয়ার পরেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন সবাই। ক্যাপ্টেন ইসলাম বলেন, ‘মনে হয়েছে, আল্লাহই আমাদের পথ দেখিয়েছেন।’

তিনি জানান, জাহাজে থাকা নাবিকদের পাশাপাশি দেশে থাকা স্ত্রী-সন্তানকেও প্রতিদিন আশ্বস্ত করতে হয়েছে। কারণ তারাও দিনের পর দিন উদ্বেগে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন।

প্রতিবার বাড়ি ফিরলে পরিবার তাকে সমুদ্রের চাকরি ছেড়ে দিতে বলে। তবে এখনই থামতে রাজি নন মোহাম্মদ ইসলাম। তার কথায়, ‘আমি আরও অনেক বছর সমুদ্রে কাজ করে যেতে চাই।’

সূত্র: এএফপি

বিজ্ঞাপন

Recommended For You