
বাংলা রিডার ডেস্ক
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা ড. মহীউদ্দীন খান (মখা) আলমগীরের বিরুদ্ধে পদ্মা ব্যাংক (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক)-এ দুর্নীতি, ঋণ কেলেঙ্কারি ও অর্থ পাচারের বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU), পদ্মা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।
কীভাবে ঘটেছে লুটপাট?
মখা আলমগীর চেয়ারম্যান থাকাকালীন ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৩৩০০ কোটি টাকা লোপাট হয়। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী বাবুল চিশতির মাধ্যমে আরও ১৭০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়। ফলে পদ্মা ব্যাংক থেকে মোট প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা উধাও হয়ে যায়। বর্তমানে ব্যাংকটির ৮৬% ঋণই খেলাপি।
৩৩টি অ্যাকাউন্টে ৪০০ কোটি টাকার লেনদেন
তদন্তে উঠে এসেছে, মখা আলমগীর, তার স্ত্রী সিতারা আলমগীর ও তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা ৩৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট ৩৯৮.৯১ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।
এর মধ্যে ২০০ কোটি টাকা জমা হলেও, ১৯৭ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। এখন সেখানে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ২.৮২ কোটি টাকা। আদালতের নির্দেশে অ্যাকাউন্টগুলো বর্তমানে স্থগিত।
ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাচার
ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারে ব্যবহার করা হয়: শুভ অটোরাইস মিল, সুলতানা ফিলিং স্টেশন, মেসার্স সুলতানা অয়েল মিল, গুলবাহার হিমাগার লিমিটেড, সুলতানা ফাউন্ডেশন।
এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ অনুমোদন নিয়ে টাকা সরিয়ে ফেলা হয় এবং গ্রাহকদের আমানত লুট করে নেওয়া হয়।
বিদেশে অবস্থান, তদন্তের আহ্বান
সূত্র জানায়, বর্তমানে মখা আলমগীর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। BFIU-এর প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানি লন্ডারিং এবং কর ফাঁকির সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া আইএফআইসি, যমুনা ও অন্যান্য ব্যাংকও ব্যবহৃত হয়েছে এসব লেনদেনে। BFIU সুপারিশ করেছে আরও তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার।
ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারির পেছনের গল্প
২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া ফারমার্স ব্যাংক চালুর পর থেকেই শুরু হয় অবৈধ নিয়োগ-বাণিজ্য, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ ও অর্থ আত্মসাৎ।
মখা আলমগীর ও বাবুল চিশতি ছিলেন এই কেলেঙ্কারির মূল হোতা। গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে নিজেদের অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করা হয়।
ব্যাংকের ভেতরের লুটপাটে সাধারণ গ্রাহকরা টাকাও তুলতে পারেননি, এমনকি সরকারের জলবায়ু তহবিলের টাকা ফেরত দেওয়ার সামর্থ্যও ছিল না।
সরকারের হস্তক্ষেপ ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০১৭ সালে চাপে পড়ে মখা আলমগীর চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর সরকারের হস্তক্ষেপে ব্যাংকটির নাম বদলে পদ্মা ব্যাংক রাখা হয়।
সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ব্যাংক ও আইসিবি মিলিয়ে প্রায় ৭০% মালিকানা সরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে যায়, বিনিময়ে তারা ৭১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে।
২০১৮ সালে চৌধুরী নাফিজ সরাফাত নতুন চেয়ারম্যান হন। কিছু স্থিতিশীলতা এলেও পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে তিনিও বিদেশে।
দণ্ডিত চিশতি পরিবার
বাবুল চিশতি ও তার ছেলে রাশেদুল হক চিশতিকে ১৬০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
পদ্মা ব্যাংকের অবস্থান
বর্তমান চেয়ারম্যান শওকত আলী খান বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। আমরা এখন অনাবশ্যক ব্যয় কমিয়ে, খেলাপি ঋণ আদায় করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করছি।”



