
বাংলা রিডার ডেস্ক
রাজধানী ঢাকায় বৃষ্টি নামলেই যেন নিত্যদিনের চিত্র—পানি জমে সড়ক অচল, জনজীবন বিপর্যস্ত। তবে বুধবার (১ অক্টোবর) ভোর থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বৃষ্টিতে এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। এতে করে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ সাধারণ নাগরিকেরা পড়েন চরম দুর্ভোগে।
উত্তরের জলাবদ্ধতা
ঢাকা উত্তর সিটির মিরপুর-১০, কালশী, শেওড়াপাড়া, কচুক্ষেত, তুরাগ ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে রাস্তাগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি। অনেক স্থানে দুর্গন্ধযুক্ত বৃষ্টির পানি ও নর্দমার জল মিশে একাকার হয়ে যায়, যা পায়ে হেঁটে চলাচলকেও করে তোলে বিপজ্জনক। যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
দক্ষিণেও একই চিত্র
দক্ষিণ সিটির জুরাইন, গেণ্ডারিয়া, মুগদা, মেরাদিয়া, খিলগাঁও, আরামবাগ, মতিঝিল ও পুরান ঢাকায়ও একই অবস্থা। পানি ঢুকে পড়েছে দোকানপাট ও ঘরে ঘরে। স্থানীয়রা বলছেন, পানির সঙ্গে সড়কের গর্ত মিশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে উঠেছে।
জনদুর্ভোগ ও আর্থিক ক্ষতি
বৃষ্টির পানি ও কাদা মাড়িয়ে প্রতিদিন কাজে পৌঁছাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। রিকশা, অটোরিকশা ও বাস ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছে যানজটে। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকদের আয়ও কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, দোকানে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে।
দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে
পানি নামার পর রাস্তায় জমে থাকা কাদা ও ভাঙা ইট-সিমেন্ট পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। কোথাও মোটরসাইকেল গর্তে পড়ছে, কোথাও রিকশার চাকা আটকে যাচ্ছে নর্দমার পাথরে। বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ
নগরবাসীর অভিযোগ, জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ হলো ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা। অনেক এলাকায় খোলা ড্রেন রয়েছে, আবার কোথাও ড্রেন নির্মাণ অসম্পূর্ণ বা অকার্যকর। মিরপুর-১০ এলাকার মুদি দোকানি খাইরুল ইসলাম বলেন, “প্রতিদিন দোকান খুলে দেখি পানি জমে আছে। দুর্গন্ধে ব্যবসা চালানোই কষ্টকর হয়ে পড়ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা ভরাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা ঢাকাকে প্রতি বর্ষায় দুর্ভোগের নগরীতে পরিণত করছে। তাদের পরামর্শ, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল উদ্ধার, সঠিক নকশায় ড্রেন নির্মাণ, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদেরও হতে হবে সচেতন।
সিটি করপোরেশনের দাবি
উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন দাবি করছে, তারা নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করছে। তবে অবৈধ দখল, খাল-নালা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নাগরিকদের অসচেতনতার কারণেই পানি নামতে দেরি হচ্ছে। অনেকেই ড্রেনে ময়লা ফেলায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ২০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা “অতি ভারী বৃষ্টিপাত” হিসেবে চিহ্নিত। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এটি একটি বিরল মাত্রার বৃষ্টি। আগামী ছয় ঘণ্টার মধ্যেও ঢাকাসহ আশপাশে বৃষ্টি অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস রয়েছে।
বুধবার সকাল ৬টায় ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ২৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসে আর্দ্রতা ছিল ৯৮ শতাংশ। গতকাল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
রাজধানী ঢাকায় বুধবারের ভারী বৃষ্টিপাতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নাগরিক অসচেতনতা মিলে পরিস্থিতি করেছে চরম। দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়—এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।



