
বাংলা রিডার ডেস্ক
আগামী অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো নির্বাচনের তারিখ বা সময়সূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
তবে সম্ভাব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের প্রস্তুতির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে গত ১৮ আগস্ট পুলিশ মহাপরিদর্শক, ১৯ আগস্ট আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক এবং সোমবার (২৪ আগস্ট) বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার ভোট শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এরপর পর্যায়ক্রমে পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে। এর আগে বলা হয়েছিল, অক্টোবরের প্রথমার্ধে ইউনিয়ন পরিষদের ভোট শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে আগস্টে তফসিল দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
তবে ২৪ আগস্ট সিইসি জানিয়েছেন, এখনই ভোটের দিনক্ষণ বলা সম্ভব নয়।
নির্বাচন আয়োজনের সময় দুর্গাপূজা, বন্যার সম্ভাবনা, আবহাওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সিইসি বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরই ভোটের দিকে এগোতে চান তারা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আইন ও বিধিমালার কিছু সংশোধনের কাজ চলছে এবং সংশোধিত প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কারণও স্পষ্ট করেছেন সিইসি। গত মে মাসে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি অতীতের সহিংসতার চিত্র তুলে ধরেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ২৩৬ জন এবং ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১১৩ জন নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এ ধরনের সহিংসতা বন্ধ করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি রক্তপাতহীন নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
সিইসি আরও বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতার প্রবণতা কিছুটা বেশি। এ কারণে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকরভাবে মোতায়েনের ওপর জোর দিচ্ছে কমিশন। ২৪ আগস্ট তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনে যে মানদণ্ড তৈরি হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন তার চেয়ে খারাপ হবে না, বরং আরও ভালো করার চেষ্টা থাকবে।
এই উদ্বেগের বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেছে পুলিশ প্রধানের সঙ্গে বৈঠকে। ১৮ আগস্ট সিইসির সঙ্গে বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেল গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি প্রতিবেদনও চেয়েছে কমিশন। পুলিশ পক্ষ থেকে দ্রুত সেই প্রতিবেদন দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
পুলিশের বিদ্যমান মনিটরিং ব্যবস্থাকেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় মাঠপর্যবেক্ষণে কাজে লাগাতে চায় কমিশন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কতটা মোতায়েন করা সম্ভব হবে, সে বিষয়েও পুলিশের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ ভোটের তফসিল ঘোষণার আগেই কোন এলাকায় কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে, তা চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এরপর আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনসংক্রান্ত প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেছে কমিশন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আনসার বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তাদের প্রস্তুতিকেও আগেভাগে সমন্বয়ের আওতায় আনা হচ্ছে।
বিজিবি মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠকেও একই ধরনের আগাম প্রস্তুতির বার্তা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে বিজিবিকে নির্বাচন সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ শুরু করার জন্য আগাম নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নাও থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিজিবির ওপর তুলনামূলকভাবে বড় দায়িত্ব পড়তে পারে। নির্বাচন যাতে সুন্দর, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে অনুষ্ঠিত হয়, সে জন্য আগাম প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ এ বিষয়ে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেননা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশি হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সংঘাত ও সহিংসতার ঝুঁকি অতীতেও দেখা গেছে। তাই ধাপে ধাপে ভোট আয়োজন করে প্রতিটি ধাপের অভিজ্ঞতা পরবর্তী ধাপের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় কাজে লাগানোর চিন্তা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পুলিশ, বিজিবি ও আনসারকে দায়িত্বে রেখে নির্বাচন পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে আপাতত সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই। কিন্তু যদি এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যে সশস্ত্র বাহিনীকে কাজে লাগাতে হবে, তখন আমরা ভেবে দেখব।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইন ও বিধিমালা সংশোধন। কমিশন পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আচরণবিধি ও নির্বাচন পরিচালনার বিধি নিয়ে কাজ করছে। আচরণবিধির খসড়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচন পরিচালনার নিয়মও চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এসব কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তফসিল ঘোষণার ক্ষেত্রে কিছুটা সময় প্রয়োজন হবে।
দেশে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন মিলিয়ে চার হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় নির্বাচন কমিশনের সামনে একসঙ্গে বড় ধরনের নির্বাচন আয়োজনের চাপ রয়েছে। এ কারণেই একদিনে সব ভোট না করে ধাপে ধাপে নির্বাচন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতাকেও স্থানীয় সরকার ভোটের প্রস্তুতিতে কাজে লাগাতে চাইছে কমিশন। সিইসি সোমবার নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার যে মানদণ্ড তৈরি হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তার নিচে নামতে চান না তারা। বরং আরও ভালো নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য রয়েছে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে অতীতের সংঘাতের ইতিহাস থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েই কমিশনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
সব মিলিয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকলেও নির্বাচন কমিশন বসে নেই। ভোটের সম্ভাব্য সময়, আইন ও বিধিমালা, আচরণবিধি, ভোটার তালিকা, মাঠ প্রশাসনের প্রস্তুতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা যাচাইয়ের কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে তারা। পুলিশের পর আনসার ও বিজিবিকে প্রস্তুতির বার্তা দেওয়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, অক্টোবর থেকে ভোট শুরু করার সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই মাঠের নিরাপত্তা কাঠামো আগেভাগে গুছিয়ে নিতে চাইছে কমিশন। তবে চূড়ান্ত তফসিল ও ভোটের তারিখ নির্ধারণের আগে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি। সরকার থেকে যখন বলা হবে, যেন আমরা নির্বাচনটা করে ফেলতে পারি। আমাদের ৪৫ দিন আগে জানালেই নির্বাচন করে ফেলতে পারব।’
জানা গেছে, দেশে মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরে নির্বাচন উপযোগী হবে ৩ হাজার ৯৮১টি ইউপি। বাকিগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালে ভোট উপযোগী হবে।
এছাড়া দেশের ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে ৩২০টি নির্বাচন উপযোগী হয়েছে। আইনি জটিলতায় ১০টি পৌরসভা নির্বাচন উপযোগী নয়।
এদিকে নতুন পাঁচটিসহ দেশে মোট উপজেলা ৫০০টি। সবগুলোই নির্বাচন উপযোগী। নতুন করে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা ভাগ করে মোকামতলা, কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা ভাগ করে মাতামুহুরী, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা ভাগ করে রুহিয়া ও ভুল্লী এবং লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা ভাগ করে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা গঠন করা হয়েছে।
অন্যদিকে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ দেশে মোট ১৩টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। বর্তমানে সবগুলোই নির্বাচন উপযোগী। ইউপি ছাড়া অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রশাসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউপি, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচন কয়েক ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। এ ক্ষেত্রে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হবে। সাধারণত স্থানীয় নির্বাচনে ১৩ থেকে ২২ জনের ফোর্স কেন্দ্রে মোতায়েন করা হয়। এছাড়াও বিজিবিসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত থাকেন।



