পেছনের পথে বাংলাদেশ ক্রিকেট!

বাংলা রিডার ডেস্ক
“একসময় বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার স্বপ্ন দেখতাম, আর এখন জিম্বাবুয়ে-আফগানিস্তানকে হারানোর স্বপ্ন দেখতে হয়। আসলেই আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে!”—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন আক্ষেপ ঝরেছে এক বাংলাদেশি ক্রিকেট সমর্থকের কণ্ঠে।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স নিয়ে সমর্থকদের হতাশার চিত্র যেন ফুটে উঠেছে এই বক্তব্যে। যে দলকে ঘিরে একসময় বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে সাফল্যের স্বপ্ন দেখতেন ভক্তরা, সেই দল এখন তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও জয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে—এমনটাই মনে করছেন অনেকে।

আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাটিতে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। উদ্দেশ্য আগামী বছর অনুষ্ঠিতব্য ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে নিজেদের প্রস্তুতি ঝালিয়ে নেওয়া। তবে শুরুতেই যেন ‘রিয়েলিটি চেক’ হয়ে গেল চরমভাবেই।

ট্রাই-নেশন সিরিজে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৯৯ রানের বড় ব্যবধানে হারের পর আফগানিস্তানের বিপক্ষে শুধু জিতলেই হতো না। সেই সঙ্গে সমীকরণের মারপ্যাঁচও ছিল। আগে বাংলাদেশ ব্যাট করতে নামায় তাদের জিততে হতো ৪১ রানের ব্যবধানে। অথচ এমন ম্যাচে ব্যাটিংয়ে যেই ঝলকটা দরকার ছিল তার ছিঁটেফোটাও দেখা যায়নি।

৭ ওভারের মধ্যে ২৮ রানে বাংলাদেশের টপ-অর্ডারের চার ব্যাটার সাজঘরে ফিরে গেছেন। শেষ পর্যন্ত ৪১ দশমিক ২ ওভারে ১৬০ রানে অলআউট। জবাবে মাত্র ৩ উইকেট হারিয়েই ম্যাচ বের করে নেয় আফগানিস্তান। ফলাফল, টানা দুই ম্যাচ হেরে বিদায় বাংলাদেশের। ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে খেলবে আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ে।

জিম্বাবুয়ে কিংবা আফগানিস্তান অন্তত ওয়ানডেতে এমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে জয় পেলে তেমন বাহবা পাওয়া যায় না। কিন্তু হারলে ট্রল বন্যা অবধারিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একদিনের ক্রিকেটে এই দুই দল বাংলাদেশের বিপক্ষে যেন স্পষ্ট ফেভারিট। গতকালকের ম্যাচসহ সর্বশেষ ৭ ওয়ানডেতে আফগানদের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় মাত্র ১টি। অন্যদিকে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রেকর্ড অস্বস্তির। সর্বশেষ ৭ ম্যাচে জয় কেবল দুটিতে।

একসময় বাংলাদেশের ক্রিকেটে কিছুটা স্বস্তির ফরম্যাট ছিল ওয়ানডে বা ৫০ ওভারের ম্যাচ। দেশে কিংবা দেশের বাইরে ভালো কিছু জয় আশা দেখাচ্ছিল। যদিও চূড়ান্ত তেমন কোনো সফলতা আসেনি। তবুও ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স আশাবাদী করছিল অনেককেই। কিন্তু সেই প্রিয় ফরম্যাটেই যেন নিজেদের ভুলতে বসেছে বাংলাদেশ।

সর্বশেষ ৭ ওয়ানডেতে আফগানদের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় মাত্র ১টি। অন্যদিকে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রেকর্ড অস্বস্তির। সর্বশেষ ৭ ম্যাচে জয় কেবল দুটিতে।

দেশের মাটিতে যদিও রেকর্ড কিছুটা ভালো। চলতি বছরেই ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। দেশের বাইরে খেলতে নামলেই যেন কঙ্কালটা বেরিয়ে আসছে। বিশেষ করে ছন্নছাড়া ব্যাটিং প্রায় নিয়মিত দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ত্রিদেশীয় সিরিজের দুই ম্যাচের কোনোটিতেই দুইশোর গণ্ডি পেরোতে পারেনি বাংলাদেশ। প্রশ্ন উঠছে ক্রিকেটারদের নিবেদন নিয়েও। বাংলাদেশের খেলা দেখলে যে কেউ ভাবতে পারেন, হয়তো জোর করেই এদের খেলতে পাঠানো হয়েছে। যেন দ্রুত শেষ করতে পারলেই বাঁচে!

ঢাকা পোস্টকে বিসিবির একজন পরিচালক বললেন, ‘যে ব্যাটিং হলো আপনি কি বলবেন? ওয়ানডেতে প্রতিদিন এমন হচ্ছে শেষ কয়েক ম্যাচে। আমরা ৫০ ওভার খেলতে পারছি না। আমি বলব কমিটমেন্টের অভাব। দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে যেমনটা খেলা উচিত সেটা হচ্ছে না, খেলোয়াড়দের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সেটাই বলছে। এভাবে তো চলতে পারে না। আমাদের উন্নতির পথ খুঁজতে হবে, তার জন্য যা করা দরকার তাই করতে হবে।’

দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে যেমনটা খেলা উচিত সেটা হচ্ছে না, খেলোয়াড়দের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সেটাই বলছে। এভাবে তো চলতে পারে না। আমাদের উন্নতির পথ খুঁজতে হবে, তার জন্য যা করা দরকার তাই করতে হবে।
বিসিবির একজন পরিচালক
বারবার সুযোগ পাওয়ার পরও ভালো করতে পারছেন না সৌম্য সরকার। ওপেনিংয়ে তানজিদ হাসান কিছু ম্যাচে আশা দেখালেও তাকে সঙ্গ দেওয়ার যেন কেউ নেই। নাজমুল হোসেন শান্ত, তাওহিদ হৃদয়রা কেউই ভালো করতে পারছেন না। টপঅর্ডার ব্যর্থ হলেই যেন ম্যাচ সেখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে, মিডল অর্ডারে ভরসা দেওয়ার মতো কেউ নেই! ব্যাটাররা ধারাবাহিক ব্যর্থ হলে বোলারদের জন্যও কাজটা কঠিন হয়ে যায়। আপনি মাত্র ১৬০ রানের পুঁজি নিয়ে তাদের ওপর আর কতটাই বা ভরসা করতে পারবেন। তবুও যেন এক তাসকিন ছাড়া আর কেউ বল হাতে সেভাবে ইম্পেক্ট ফেলতে পারছেন না! দল কি তাহলে নাহিদ রানার অভাবে ভুগছে? ইনজুরির কারণে বেশ অনেকদিন ধরেই দলে নেই টাইগার এই পেসার।

দল নির্বাচন নিয়েও প্রশ্নটা প্রত্যাশিতভাবে উঠছে। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক ওপেনার ইমরুল কায়েসও। দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত বা স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান থাকা অনুচিত বলে মত দিয়েছেন ১৩১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এই বাংলাদেশি ব্যাটা, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ক্রিকেট বোর্ডের উচিত সম্পূর্ণভাবে মেধা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার সাথে সেরা সম্ভাব্য একাদশ নির্বাচন করা। ক্রিকেট একটি পুরো জাতির প্রতিনিধিত্ব করে এবং জাতীয় দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত বা স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।’

ক্রিকেট একটি পুরো জাতির প্রতিনিধিত্ব করে এবং জাতীয় দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত বা স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান থাকা উচিত নয়।
ইমরুল কায়েস
আরেকটি পোস্টে ইমরুল কায়েস দেশের ক্রিকেটের উল্টো যাত্রার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দলের পারফরম্যান্স দেখে আমার মনে হয়েছে, আমরা যেন আবার সেই ২০০৬–২০০৮ সালের বাংলাদেশ ক্রিকেটের জায়গাতেই ফিরে গেছি। এত বছর পরও যদি আমাদের একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাহলে আমাদের উন্নতির পথটা আসলে কোথায়?’

সাবেক এই ওপেনারের মতে, ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রত্যাশা অনুযায়ী ধারাবাহিক উন্নতি করতে পারেনি। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে। এর নেপথ্য কারণ হিসেবে তিনি বলছিলেন, ‘আমার মনে হয়, এর অন্যতম বড় কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, দল গঠনে ধারাবাহিকতা না থাকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ বা ইগোর প্রভাব থাকার আশঙ্কা। কে দলে থাকবে, কে বাদ পড়বে, কাকে সুযোগ দেওয়া হবে—এসব সিদ্ধান্ত যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক ফলাফল কিংবা ব্যক্তিগত বিবেচনার ওপর নির্ভর করে, তাহলে একটি শক্তিশালী দল গড়ে তোলা কঠিন।’

এশিয়ান গেমসে ব্যর্থতার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়েছিলেন লিটন দাস। ইনজুরির কারণে সদ্য ত্রিদেশীয় সিরিজে খেলতে পারেননি তিনি। তার পরিবর্তে দায়িত্ব সামলেছেন তাওহিদ হৃদয়। আসলে সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে, এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে। জবাবে বলছিলেন, ‘কেন খারাপ করছি, এত গভীরে চিন্তা করিনি। দুই সিরিজ আগেও আমরা হোমে ভালো খেলেছি। আমি একমত যে দেশের বাইরে ভালো খেলছি না। প্রায় দেড় বছর হয়ে গেছে এমন। বাইরের কন্ডিশনে দ্রুত মানিয়ে নেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে ম্যাচের সিচুয়েশন ডিমান্ড অনুযায়ী অ্যাক্ট করা জরুরি। শুধু মুখে বললে হবে না। আমরা অ্যাকশনে করতে পারছি না। এটা আমাদের ব্যাটারদের ব্যর্থতা।’

কোনো টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়ার আগেই বেশ উচ্চাকাঙক্ষা দেখা যায় বাংলাদেশের ক্রিকেটার বা কোচিং স্টাফদের। সেগুলো যে কেবল কথার কথা সেটা একপ্রকার মেনে নিলেন এই ব্যাটার। হৃদয় বলছিলেন, ‘আমরা বড় কোনো সিরিজ, ত্রিদেশীয় সিরিজ, এশিয়া কাপ কিংবা বিশ্বকাপে যখন খেলতে যাই, ব্যক্তিগতভাবে এবং দল হিসেবে সবাই ট্রফি জিততে চাই। কিন্তু আমরা শুধু মুখেই বলি, কাজে সেটার প্রতিফলন দেখা যায় না।’

২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে ত্রিদেশীয় সিরিজটা যেন ‘আশার বেলুনটা ফুটো’ করে দিয়েছে বাংলাদেশের। আর এক বছরেরও কম সময় আছে আসন্ন বিশ্বকাপের। তার আগে এশিয়া কাপসহ কিছু অবশ্য হাতে আছে। তবে এর মধ্যে নিজেদের ভুলগুলো শুধরে কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

বিজ্ঞাপন

Recommended For You