‘হাসু ও কামাল আমাকে ছাড়তে চায় না’

বুধবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৮ ০২:১৩:৫৯ পূর্বাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  

রিডার::অসমাপ্ত আত্মজীবনী(২০৬-২১০ পৃষ্ঠা)

এই আত্মজীবনী সংগ্রাম ও প্রেমের সমান্তরাল বয়ান। পড়তে গিয়ে আবেগে ছলকে উঠে চোখ ও বাষ্পরুদ্ধ হয়ে যায় কণ্ঠ। এই গ্রন্থ বাঙালির ইতিহাসের এক অনবদ্য দলিল। এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে মহাজীবনের মহামূল্যবান অভিজ্ঞতার মানিক-রতন। সেই জীবনীর কিছু অংশ পাঠকের জন্য এখানে পত্রস্থ করা হল।

সকাল দশটার দিকে খবর পেলাম আব্বা এসেছেন। জেলগেটে আমাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই কর্তৃপক্ষ তাঁকে ভিতরে নিয়ে আসলেন। আমাকে দেখেই আব্বার চোখে পানি এসে গেছে। আব্বার সহ্যশক্তি খুব বেশি। কোনো মতে চোখের পানি মুছে ফেললেন। কাছে বসে আমাকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং বললেন, তোমার মুক্তির আদেশ হয়েছে, তোমাকে আমি নিয়ে যাব বাড়িতে।

আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম, তোমার মা, রেণু, হাসিনা ও কামালকে নিয়ে, দুই দিন বসে রইলাম কেউ খবর দেয় না, তোমাকে কোথায় নিয়ে গেছে। তুমি ঢাকায় নাই একথা জেলগেট থেকে বলেছে। যদিও পরে খবর পেলাম, তুমি ফরিদপুর জেলে আছ। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ। নারায়ণগঞ্জ এসে জাহাজ ধরব তারও উপায় নেই।

তোমার মা ও রেণুকে ঢাকায় রেখে আমি চলে এসেছি। কারণ আমার সন্দেহ হয়েছিল তোমাকে ফরিদপুর নেওয়া হয়েছে কি না। আজই টেলিগ্রাম করবো, তারা যেন বাড়িতে রওয়ানা হয়ে যায়।

 

পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু

 

আমি আগামীকাল বা পরশু তোমাকে নিয়ে রওয়ানা করর, বাকি খোদা ভরসা। সিভিল সার্জন সাহেব বলেছেন, তোমাকে নিয়ে যেতে লিখে দিতে হবে যে, ‘আমার দায়িত্বে নিয়ে যাচ্ছি।’ আব্বা আমাকে সান্ত¡না দিলেন এবং বললেন, তিনি খবর পেয়েছেন মহিউদ্দিনও মুক্তি পাবে, তবে একসাথে ছাড়বে না, একদিন পরে ছাড়বে।পরের দিন আব্বা আমকে নিতে আসলেন।

অনেক লোক জেলগেটে হাজির। আমাকে স্ট্রেচারে করে জেলগেট নিয়ে যাওয়া হলো এবং গেপের বাইরে রেখে দিল, যদি কিছু হয় বাইরে গিয়ে হোক, এই তাদের ধারণা।

আমাকে কয়েকজনে বয়ে নিয়ে গেল আলাউদ্দিন খান সাহেবের বাড়িতে। সেখানে কিছু সময় রাখল। বিকালে আমার বোনের বাড়িতে নিয়ে আসল। রাতটা সেখানে কাটালাম। আত্মীয়স্বজনসহ অনেক লোক আমাকে দেখতে আসল। আব্বা আমার কাছেই রইলেন। পরের দিন সাকালে আমার এক বন্ধু ট্যাক্সি নিয়ে এল। সে নিজেই ড্রাইভ করে আমাকে ভাঙ্গায় নিয়ে আসল। আব্বা একটা বড় নৌকা ভাড়া করলেন। আমার ফুপুর বাড়ি রাস্তার পাশেই। তিনি রাস্তায় চলে এসেছেন আমাকে দেখতে।

আব্বাকে বললেন, তাদের বাড়ি নূরপুর গ্রামে থাকতে। আব্বা বললেন, এখান থেকে নৌকায় বড় বোনের বাড়ি দত্তপাড়া যাবেন। সেখানে আরও একদিন থাকবেন। একটু সুস্থ হলে বড়বোনকে সাথে নিয়ে বাড়িতে যাবেন। আমি অনেকটা সুস্থ বোধ করছি, যদিও খুবই দুর্বল।

 

পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু

 

দত্তপাড়া মাদারীপুর মহকুমায়, সেখান থেকে একদিন একরাত লাঘবে গোপালগঞ্জ পৌঁছাতে নৌকায়। সিন্ধিয়া ঘাটে কর্মীরা বসে আছে খবর পেয়ে। আমাকে দেখেই তারা স্টিমারে গোপালগঞ্জ রওয়ানা করল। আমি কয়েক ঘণ্টা পরে গোপালগঞ্জ পৌঁছে দেখি, বিরাট জনতা, সমস্ত নদীল পাড় ভরে গেছে। আমাকে তারা নামাবেই।

আব্বা আপত্তি করলেও তারা শুনল না। আমাকে কোলে করে রাস্তায় শোভাযাত্রা বের করল এবং আমার নৌকায় পৌঁছে দিল। আব্বা আর দেরি না করে আমাকে নিয়ে বাড়িতে রওয়ানা করলেন। কারণ- আমার মা, রেণু ও বাড়ির সকলে আমার জন্য ব্যস্ত হয়ে আছে। আমার ভাইও খবর পেয়ে খলনা থেকে রওয়ানা হয়ে চলে এসেছে।

পাঁচদিন পর বাড়ি পৌঁছালাম। মাকে তো বোঝানো কষ্টকার। হাসু আমার গলা ধরে প্রথমেই বলল, আব্বা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই। একুশে ফেব্রুয়ারি ওরা ঢাকায় ছিল, যা শুনেছে তাই বলে চলেছে। কামাল আমার কাছে আসল না, তবে আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি খুব দুর্বল, বিছানায় শুয়ে পড়লাম। গতকাল রেণু ও মা ঢাকা থেকে বাড়ি এসে আমার প্রতীক্ষায় দিন কাটাচ্ছিল।

এক এক করে সকলে যখন আমার কামরা থেকে বিদায় নিল, তখন রেণু কেঁদে ফেলল এবং বলল, তোমার চিঠি পেয়ে আমি বুঝেছিলাম তুমি কিছু একটা করে ফেলবা। আমি তোমাকে দেখবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কাকে বলব নিয়ে যেতে, আব্বাকে বলতে পারি না লজ্জায়। নাসের ভাই বাড়ি নাই। যখন খবর পেলাম খবরের কাগজে তখন লজ্জা-শরম ত্যাগ করে আব্বাকে বললাম। আব্বা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাই রওয়ানা করলাম ঢাকায়, সোজা আমাদের বড় নৌকায় তিনজন মাল্লা নিয়ে।

 

বঙ্গবন্ধুর বাবা, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধুর মা, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা (বা দিক থেকে)

 

— কেন তুমি অনশন করতে গিয়েছিলে? এদের কি দয়া-মায়া আছে? আমাদের কারো কথাও তোমার মনে ছিল না? কিছু একটা হলে কী উপায় হতো? আমি এই দুটা দুধের বাচ্চা নিয়ে কী করে বাঁচতাম? হাসিনা, কামালের অবস্থা কী হতো? তুমি বলবা খাওয়া-দাওয়া কষ্ট তো হতো না? মানুষ কি শুধু খাওয়া পরা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়?

আর মরে গেলে দেশের কাজই-বা কীভাবে করতা? আমি তাকে কিছুই বললাম না। তাকে বলতে দিলাম, কারণ মনের কথা প্রকাশ করতে পারলে ব্যথাটা কিছু কমে যায়। রেণু খুব চাপা, আজ যেন কথার বাঁধ ভেঙে গেছে।

 

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু

 

শুধু বললাম, উপায় ছিল না। বাচ্চা দুইটা ঘুমিয়ে পড়েছে। শুয়ে পড়লাম। সাতাশ-আটাশ মাস পরে আমার সেই পুরানা জায়গায়, পুরানা কামরায়, পুরানা বিছানায় শুয়ে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠের দিনগুলির কথা মনে পড়ল। ঢাকার খবর সবই পেয়েছিলাম। মহিউদ্দিনও মুক্তি পেয়েছে। আমি বাইরে এলাম আর আমার সহকর্মীরা আবার জেলে গিয়েছে।

পরের দিন সকালে আব্বা ডাক্তার আনলেন। সিভিল সার্জন সাহেবের প্রেসক্রিপশনও ছিল। ডাক্তার সকলকে বললেন, আমাকে যেন বিছানা থেকে উঠতে না দেওয়া হয়।

দিন দশেক পরে আমাকে হাঁটতে হুকুম দিল শুধু বিকেল বেলায়। আমাকে দেখতে রোজই অনেক লোক বাড়িতে আসত। গোপালগঞ্জ, খুলনা ও বরিশাল থেকেও আমার কিছু সংখ্যক সহকর্মী এসেছিল।

একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাসু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাসু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। একসময় কামাল হাসিনাকে বলছে, ‘হাসু আপা, হাসু আপা তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ আমি আর রেণু দুজনেই শুনলাম।

আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল।

বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেকদিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস।

রাজনৈতিক কারণে একজনকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখা আর তার আত্মীয়স্বজন ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা কে বুঝবে?

 

মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়। আজ দুইশত বত্সর পরে আমরা স্বাধীন হয়েছি। সামান্য হলেও কিছু আন্দোলনও করেছি স্বাধীনতার জন্য। ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস, আজ আমাকে ও আমার সহকর্মীদের বছরের পর বছর জেল খাটতে হচ্ছে।

আরও কতকাল খাটতে হয়, কেইবা জানে? একে কি বলে স্বাধীনতা? ভয় আমি পাই না, আর মনও শক্ত হয়েছে।

 

 

মার্চ মাস পুরাটাই বাড়িতে থাকতে হলো। শরীরটা একটু ভালো হয়েছে, কিন্তু হার্টের দুর্বলতা আছে। আব্বা আমাকে ছাড়তে চান না। ডাক্তারও আপত্তি করে। রেণুর ভয় ঢাকায় গেলে আমি চুপ করে থাকব না, তাই আবার গ্রেফতার করতে পারে। আমার মন রয়েছে ঢাকায়, নেতারা ও কর্মীরা সকলেই জেলে।

এই সময় মানিক ভাইয়ের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম। তিনি আমাকে অতিসত্ত্বর ঢাকায় যেতে বলেছেন। চিকিত্সা ঢাকাতেই করা যাবে এবং ঢাকায় বসে থাকলেও কাজ হবে। আমি আব্বাকে চিঠিটা দেখালাম। আব্বা চুপ করে থাকলেন কিছু সময়। তারপর বললেন, যেতে চাও যেতে পার। রেণুও কোনো আপত্তি করল না।

 

 

টাকা-পয়সাও দরকার। খবর পেয়েছি আমার বিছানাপত্র কাপড়চোপড় কিছুই নেই। আবার নতুন করে সকল কিছু কিনতে হবে। আব্বাকে বললাম খাট, টেবিল-চেয়ার, বিছানাপত্র সকল কিছুই নতুন করে কিনতে হবে। আমার কিছু টাকার দরকার। কয়েক মাসের খরচও লাগবে। রেণুও কিছু টাকা আমাকে দিল গোপনে। আব্বার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঢাকায় রওয়ানা করলাম, এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। হাসিনা ও কামাল আমাকে ছাড়তে চায় না, ওদের উপর আমার খুব দুর্বলতা বেড়ে গেছে। রওয়ানা করার সময় দুই ভাইবোন খুব কাঁদল। আমি বরিশাল হয়ে ঢাকায় পৌঁছলাম।

 

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

গুজবে কান দিয়ে রংপুরের যে যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেই শহিদুন্নবী জুয়েল আদতে ধর্মভিরু... আরও পড়ুন

আদতে ধর্মভিরু মুসলিম।

নভেম্বরের শুরুতেই নয়া প্রেসিডেন্ট পেতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডাকযোগে আগাম ভোট শুরু হয়েছে চলতি মাসে। এরই... আরও পড়ুন

ডাকযোগে আগাম ভোট

হাজী সেলিমপুত্র ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বহিস্কৃত কাউন্সিলর ইরফান সেলিম এবং তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ... আরও পড়ুন

মোহাম্মদ জাহিদের তিন

টানা দশ ঘণ্টা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে বসে আলোচনার পর আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির... আরও পড়ুন

যুদ্ধবিরতির বিষয়ে

হঠাৎ করে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক মাধ্যমগুলোতে উদ্বিগ্ন আমজনতা। চলছে আন্দোলনও। দাবি উঠছে সর্বোচ্চ শাস্তি... আরও পড়ুন

ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায়

প্রায় চার মাস বাদে পদ্মা সেতুর ৩২তম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান... আরও পড়ুন

উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কাস পার্টির ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একটি নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন করেছে... আরও পড়ুন

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পাঠানো একটি বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ধ্বংস করেছে সৌদি এয়ার... আরও পড়ুন

বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ধ্বংস

করোনা আক্রান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে দেশটির ঐতিহ্য অনুযায়ী নির্বাচনী বিতর্ক... আরও পড়ুন

নির্বাচনী বিতর্ক

পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে চার শিশুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের... আরও পড়ুন

ধর্ষণের অভিযোগে চার শিশু

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।