গ্রিক পুরাণ

যে প্রেমের কারণে পৃথিবীর ঋতু বৈচিত্রময়

শনিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৮ ০৩:০১:০৫ পূর্বাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  

রিডার::আতিকুর রহমান

তখন টাইটানদের যুগ চলছে। গ্রিক পুরাণের স্বর্ণযুগ। তখন মানুষ অন্যায় করতে জানত না। ক্রোনাস তখনকার রাজা। ক্রোনাস তার বাবা ইউরেনাসকে উচ্ছেদ করে পুরো জগতে চালাচ্ছে একক অধিপত্য।

ইউরেনাস ক্রোনাসকে বলে গেছেন, ‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে, ক্রোনাস। তুমি আমার সাথে যা করেছ, সেই একই কাজ তোমার সাথে তোমার সন্তান করবে।’

সাবধানী ক্রোনাসের স্ত্রী রিয়া। দুজনের যত সন্তান হয়, বিদ্রোহ এড়াতে সবাইকে খেয়ে ফেলেন ক্রোনাস। দুজনের যত সন্তান হয়, বিদ্রোহ এড়াতে সবাইকে খেয়ে ফেলেন ক্রোনাস। রিয়া দেখল তার একটা সন্তানও বাঁচছে না। শেষের সন্তানকে বাঁচাতে তাকে সিন্দুকে ভরে পাহাড়ের গুহায় রেখে এল। ক্রোনাসের হাতে কাপড়ে জড়ানো পাথরের টুকরো তুলে দিল সেই সন্তান জিউস।

জিউস বড় হয়ে ক্রোনাসের সাথে যুদ্ধ করে তার পেট চিরে বের করে জিউসের বড় ভাইবোনদের। টাইট্যানদের হারিয়ে জগতের দখল নেয় জিউস আর তার বাহিনী।

 

 

এই সময়ের যোদ্ধারা পরবর্তী প্রজন্মের দেবতা। জিউস স্বর্গের রাজা, দেবাধিদেব। পসেইডন রাজত্ব করেন সাগরে। হেডিসের আধিপত্য পাতালে।

গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী মৃত্যুর পর আত্মা চলে যায় পাতালে। হেডিসের কাজকর্ম মৃতদের আত্মাদের নিয়ে। তিনমাথাওয়ালা কুকুর সারবেরাসকে নিয়ে বেশিরভাগ সময় তাকে দেখা যায় ভাস্কর্যে। জাগতিক চমকের থেকে পাতালপুরীর অন্ধকারই তাকে বেশি টানে। তাই খুব একটা মর্তে আসেন না হেডিস।


এদিকে পার্সিফোনি হলেন বসন্তের দেবী। জিউস আর দিমিতারের কন্যা।

বাবা দেবতাদের রাজা, মাও কম যান না। তিনি আর সব গুরুত্বপূর্ণ দেবতাদের সাথে অলিম্পাসে থাকেন। পৃথিবীতে ফসল ফলানোর দায়িত্ব তার।

তার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা তার মেয়ে, পার্সিফোনি।

গ্রিক পুরাণে পৃথিবীর সব ঘটনার পৌরাণিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পৃথিবীতে ঋতু আসার যে গল্প, তার সাথে জড়িয়ে আছেন হেডিস ও পার্সিফোনি।

 

একদিন জিউস ঠিক করলেন হেডিসের সাথে পার্সিফোনির বিয়ে দিলে মন্দ হয় না। তবে তা ভুলেও বললেন না দিমিতারকে।

পার্সিফোনি তাকে ছেড়ে পাতালে গিয়ে বসবাস করবে, একথা দুঃস্বপ্নেও হয়তো ভাবতে চাইবেন না দিমিতার। কিছু গল্প অনুযায়ী জিউস হেডিসকে বলেছিল তার মেয়েকে বিয়ে করার কথা।

আবার কিছু গল্পে জিউস কিউপিডকে পাঠায় হেডিসের কাছে।

সাধারণ নিয়মের বাইরে কোনো একদিন সকালে হেডিস মর্ত্যে উঠে এসছিলেন। চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে বলে গিয়ে দেখলেন এক নারীকে।

তিনি ভাবলেন মর্ত্যরে সকাল এত সুন্দর এই নারীর করণে।

মাথা নিচু করে ডালাতে ফুল তুলছে। সাথে আছে বনের পরীরা। হেডিস ভেবে পেলেন না এই মেয়ে কেন ফুল তুলছে। সে কি জানে না, যে এই ফুলের স্নিগ্ধতা তার স্নিগ্ধতার অংশমাত্র? নাকি মাথায় ফুল গুঁজে সে এই ফুলের জীবন ধন্য করতে চায়?

হেডিস দেখল পড়ে থাকা কিছু ফুল, সে নিজেকে ওইসব ফুলের সাথে তুলনা করল, যারা এই নারীর হাতের ছোঁয়া পায়নি। কী হবে তার এই দেবত্ব দিয়ে, তার পাতাললোকের রাজত্ব দিয়ে যদি এই নারীকে না পায়? সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়ে রইল হেডিস।

পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেল নারী। হেডিস খোঁজ নিয়ে জানলেন এই নারীই জিউসের মেয়ে পার্সিফোনি।

কিন্তু তার মা দিমিতার কোনোদিন এই বিয়ে মানবে না। পাতাললোকে ফিরে গেলেন হেডিস। দিনরাত চুপ করে থাকত। কিছুই ভালো লাগছিল না তার। শেষে স্থির করলেন, এই নারীকে তার জয় করতেই হবে, সে যত বাধাই আসুক না কেন।

সেদিনও ফুল তুলছিল পার্সিফোনি। পাতালের রাজা হেডিস কালো রঙের ঘোড়ায় টানা রথে ঝড়ের বেগে মর্ত্যে এলেন। মাটি ফুঁড়ে যখন তার রথ বের হচ্ছিল পার্সিফোনি বিষ্ময় নিয়ে চেয়ে ছিল।

 

 

তার বিষ্ময় ভয়ে পরিবর্তন হতে সময় নিল না। এক হাতে ঘোড়াদের লাগাম টেনে অন্য হাতে পার্সিফোনিকে কাঁধে উঠিয়ে নিলেন। ভয়ে চিৎকার করে উঠল সে। তার চিৎকার দেবরাজ জিউস, জাদুবিদ্যার দেবী হেকেটি, সূর্যের দেবতা হেলিওস আর মা দিমিতার শুনতে পেয়েছিল।

দিমিতার এত দূরে ছিল যে তার পক্ষে কিছু করা সম্ভব ছিল না। জিউস তো মনে মনে খুশিই হলেন। এটাই তিনি চাইছিলেন। হেকেটি শুনতে পেলেও দেখতে পায়নি কিছু। হেলিওস যেহেতু আকাশে ছিলেন তিনি দেখলেন সব।

দিমিতারের মন দুঃখে ছেয়ে গলে। হাতে মশাল নিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি কোনা খুঁজে দেখলেন তিনি। জিউস সব না জানার ভান করে পড়ে আছেন। কোথাও মেয়ের খোঁজ পাচ্ছিলেন না। বারবার মনে পড়ছিল সেই চিৎকার। না জানি কী হয়েছে পার্সিফোনির।

আর তার পরেই পৃথিবী থেকে তার সব অস্তিত্ব একবারে মিটে গেছে। যেন কখনও কেউ ছিলই না পার্সিফোনি নামে। তার এই কষ্ট দেখে এগিয়ে এল হেকেটি। বলল, সেও শুনেছিল পার্সিফোনির চিৎকার। কিন্তু দেখতে পায়নি কী হয়েছে। সে দিমিতারকে বুদ্ধি দিল হেলিওসের কাছে যেতে।

দিমিতার হেলিওসকে অনুরোধ করতেই সে সব খুলে বলল। কীভাবে জিউস চেয়েছিল তার মেয়ের বিয়ে হোক, আর হেডিস হঠাৎ এসে যেমন অপহরণ করে নিয়ে গেছে পার্সিফোনিকে।

 

কিন্তু হেলিওস দিমিতারকে বলল, পার্সিফোনিকে হেডিস সত্যিই ভালোবাসে। পার্সিফোনিকে সে সুখেই রাখবে। তার ওপর হেডিস অন্যতম ক্ষমতাধর দেবতা। এমন স্বামী পার্সিফোনি পাবে না। কিন্তু হেডিসের স্তুতিবাক্যে মন গলল না দিমিতারের।

তার অগোচরে যে ষড়যন্ত্র হয়েছে এর জন্য তিনি ক্ষমা করতে পারবেন না কাউকে। প্রাণের প্রিয় পার্সিফোনিকে না জানি কত যন্ত্রণায় রেখেছে পাতালের বর্বরটা।

পাতালের কালি ময়লায় না জানি কত কষ্টে কাটছে তার মেয়ের জীবন। এর চেয়ে পার্সিফোনির মারা যাওয়ার সংবাদও ভালো ছিল। আগের চেয়েও বেশি ভেঙে পড়লেন তিনি।

প্রতিজ্ঞা করলেন যতদিন পর্যন্ত পার্সিফোনি ফিরে না আসছে তিনি অলিম্পাস পর্বতে পা রাখবেন না, পৃথিবীতে জন্মাতে দিবেন না এক দানা শস্যও।

শুরু হল দুর্ভিক্ষ। প্রাণীরা না খেয়ে মরতে লাগল। জিউস দেখলেন এবার প্রাণপ্রকৃতি উচ্ছন্নে যাবে। দিমিতারকে তিনি অনেক বুঝাতে চেষ্টা করলেন, লাভ হল না। না পেরে বার্তার দেবতা হার্মিসকে তিনি পাঠালেন হেডিসের কাছে।

অন্যদিকে পাতালে কিন্তু তখন বসন্তের দেবীর বসন্ত চলছে। পাতালে আসার পর কিছুতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না পার্সিফোনি। পুরো সময়টা তাকে সাহায্য করেছিলেন হেডিস।

হেডিস আসলেই পার্সিফোনিকে ভালোবেসেছিলেন। পাতালে নিয়ে এসে তাকে যত্নে রেখেছিলেন। কখনও অসম্মান করেননি। অতঃপর পার্সিফোনি হার মানলেন হেডিসের তুমুল ভালোবাসার কাছে। তিনিও তখন আর হেডিসকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারেন না। হোমার তাকে পাতালে রাজকন্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন। পাতালের সুখ দুঃখ, অভিশাপ সব বয়ে আনতেন পার্সিফোনি।

 

দুজনের সংসার ভালোই চলছিল। এমন একদিন হার্মিস বার্তা নিয়ে হাজির হলেন। সব খুলে বললেন। জানালেন দেবরাজের আদেশের কথা।

পার্সিফোনিকে ফেরত পাঠাতে হবে দিমিতারের কাছে। ভেঙে পড়লেন হেডিস। কিন্তু দেবরাজের আদেশ অমান্য করার মতো সাহস তার নেই। স্বামীর মতো কষ্ট পার্সিফোনিও পাচ্ছিল। স্বামীর হাতে নিজের চিহ্ন বেদানা তুলে দিল।

বেদনা বা আনার তুলে দিয়ে গ্রিক পুরাণে প্রতিজ্ঞা করা হয়। কথা দিল, সে ফিরে আসবে।

জিউস পড়েছিলেন উভয় সংকটে। একদিকে দিমিতারের ক্রোধ, অন্যদিকে বিরহকাতর হেডিস-পার্সিফোনি।

দিমিতার তো কিছুতেই পার্সিফোনিকে কাছ ছাড়া করবেন না। পার্সিফোনির হেডিসের কালো জাদু ভাবলেন। জিউস তার মা রিয়াকে পাঠালেন দিমিতারের কাছে, যদি কিছু হয়।

রিয়া দিমিতারকে বুঝিয়ে শুনিয়ে চুক্তিতে আনল। বছরের একটা অংশ পার্সিফোনি পাতালে থাকবে, আর একটা অংশ থাকবে তার কাছে।

 

দিমিতার শর্তে রাজি হলেও বলে গেলেন, যতদিন পার্সিফোনি পাতালে থাকবে পৃথিবীতে ফসল জন্মাতে দেবেন না তিনি।

এরপর থেকে বছরের ছয়মাস পার্সিফোনি মায়ের কাছে থাকে। তখন পৃথিবীতে চলে উষ্ণতা। ফুল হয়, ফসল হয়। যখন সে পাতালে স্বামীর কাছ যায়, ডিমেটারের দুঃখে পৃথিবী শীতল থেকে শীতলতর হয়ে ওঠে। গ্রিক পুরাণে পৃথিবীর ঋতুর রহস্যকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়।

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

গুজবে কান দিয়ে রংপুরের যে যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেই শহিদুন্নবী জুয়েল আদতে ধর্মভিরু... আরও পড়ুন

আদতে ধর্মভিরু মুসলিম।

নভেম্বরের শুরুতেই নয়া প্রেসিডেন্ট পেতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডাকযোগে আগাম ভোট শুরু হয়েছে চলতি মাসে। এরই... আরও পড়ুন

ডাকযোগে আগাম ভোট

হাজী সেলিমপুত্র ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বহিস্কৃত কাউন্সিলর ইরফান সেলিম এবং তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ... আরও পড়ুন

মোহাম্মদ জাহিদের তিন

টানা দশ ঘণ্টা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে বসে আলোচনার পর আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির... আরও পড়ুন

যুদ্ধবিরতির বিষয়ে

হঠাৎ করে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক মাধ্যমগুলোতে উদ্বিগ্ন আমজনতা। চলছে আন্দোলনও। দাবি উঠছে সর্বোচ্চ শাস্তি... আরও পড়ুন

ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায়

প্রায় চার মাস বাদে পদ্মা সেতুর ৩২তম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান... আরও পড়ুন

উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কাস পার্টির ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একটি নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন করেছে... আরও পড়ুন

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পাঠানো একটি বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ধ্বংস করেছে সৌদি এয়ার... আরও পড়ুন

বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ধ্বংস

করোনা আক্রান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে দেশটির ঐতিহ্য অনুযায়ী নির্বাচনী বিতর্ক... আরও পড়ুন

নির্বাচনী বিতর্ক

পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে চার শিশুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের... আরও পড়ুন

ধর্ষণের অভিযোগে চার শিশু

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।