যে ওমরের খবর কেউ রাখে না

রিডার:: ইসরাত জাহান পৃথা

রবিবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৮ ১০:৩৫:০৪ পূর্বাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  
ভালই কেটে যাচ্ছিল

ওমর আব্দুল জাবার

চার বছর আগের কথা। সময়টা ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস। ওমর আব্দুল জাবারের জীবনটা আর দশটা সাধারণ মানুষের মতোই ছিল।ভালই কেটে যাচ্ছিল সময়টা।

ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুলের সূত্রধরের কাজ করতেন তিনি। থাকতেন শহরের মধ্যবিত্ত এলাকায় একটি দোতলা বাড়িতে সপরিবারে। তখন পরিবার বলতে তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী  রানদা, এক পুত্র, বাবা-মা এবং ছোট চার ভাই-বোন।

কিন্তু ২০১৪ সালের জুন মাসে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) যখন ইরাকের উত্তরাঞ্চলের বিশাল এলাকা দখল করে নেয়, তখন সমগ্র মসুলের সাথে সাথে তাদের জীবনও থমকে যায়।

সুন্নী প্রধান মসুলের মানুষের মধ্যে শিয়া প্রধান ইরাকি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ ছিল। ফলে আইএস যখন মসুলে প্রবেশ করে, তখন তাদেরকে খুব একটা বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়নি। কিন্তু মসুলের একাংশের সমর্থন পেলেও জনগণের অধিকাংশই ছিল আইএসের বর্বরতার বিরুদ্ধে। সেসময়টায় অনেক পরিবারই শহর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।

ওমরদের পরিবারও শুরু থেকেই আইএসের কর্মকান্ডের বিরোধী ছিল। কিন্তু তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। তাছাড়া ওমরের স্ত্রী সে সময় সন্তানসম্ভবা। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তারা রয়ে গিয়েছিলেন শহরের মধ্যেই।

মসুল সুন্নী প্রধান শহর হওয়ায় সেখানকার মানুষের সাথে আইএসের আচরণ তখনও ছিল সহনীয় পর্যায়ের। কিন্তু মসুল থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরের সিনজার শহরে তারা তাদের আক্রমণ করে। সেখানকার হাজার হাজার ইয়াজিদ ধর্মানুসারীকে কাফের ঘোষণা দিয়ে পুরষদেরকে হত্যা করে এবং নারী ও শিশুদেরকে দাস-দাসী হিসেবে বন্দী করে নিয়ে যায়।

তিন মাস পর…………

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের এক গভীর রাতে ওমরের মসুলের বাড়ির প্রধান ফটকে যখন ঘন ঘন কড়া নাড়ার আওয়াজ আসছিল, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছিল। এত রাতে আইএস এর প্রহরী ছাড়া অন্য কেউ আসার কথা না।জব্বারের বৃদ্ধ পিতা একবার তার দিকে তাকাচ্ছে, ওমর তার দিকে। বাড়িতে তিন-তিনটে নারী।

আইএসের নজর থেকে ওদের রাখবে কোথায়?

একটা পর্যায় ওমর ইশারায় বাবাকে বোঝাল দরজা খুলতেই হবে।নয়তো তারা ভেঙ্গে ফেলবে।

 

নাদিয়া মুরাদ

 

এরপর এগোনো ছাড়া উপায় ছিলনা।

আর দরজা অপর প্রান্তে যিনি কড়া নাড়ছেন, সেই ব্যাক্তি আর ওমরের জীবন পরক্ষণে যে কিভাবে নাটকীয়ভাবে পাল্টে যাবে তা স্বপ্নেও কল্পনা করেননি কেউই।

দরজা খুললে দেখা গেল আপাদমস্তক কালো বোরখায় এক নারী। আইএস এর বন্দী শিবির থেকে পালিয়ে আসা ওই তরুণী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থর থর করেই ভয়ে কাঁপছে।

মেয়েটি কাতর স্বরে তাদেরকে অনুরোধ করেছিল, ‘আমাকে বাঁচান, ওরা আমাকে ধর্ষণ করছে।’ একটিবারের জন্য অন্যকোন চিন্তা আসেনি ওমার কিংবা তার বাবার মনে। তারা স্রেফ মেয়েটাকে বাঁচাতে চেয়েছিল।

কেউ দেখার আগেই তারা আস্তে করে দরজা বন্ধ করে মেয়েটিকে ঘরে ঢুকিয়ে ফেলেন।

তখনও ওমরের পরিবারের মানুষের আতঙ্ক বিন্দুমাত্র কমেনি। কারণ শহরটির জায়গায় জায়গায় তখনও জঙ্গি সংগঠন আইএস এর চেকপয়েন্ট, এলাকার অনেকেই আইএসের সমর্থক। যেকোনো সময় কেউ দেখে ফেললেই তাদের নিজেদের জীবনও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

মেয়েটিকে দ্রুত ওপরতলায় নিয়ে আসে বাবা-ব্যাটা। জানালার ধারে যেতে বারন করে দেয়।

আইএস তথা দায়েশের বন্দী শিবির থেকে কারো পালানোর ঘটনা সেটাই প্রথম ছিল না। কিন্তু যারা পালানোর চেষ্টা করেছিল, তাদের অধিকাংশই দুই-একদিনের মধ্যে আবার ধরা পড়ে যেতো। পালিয়ে গিয়ে তারা যাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল, অনেকক্ষেত্রে তারাই আবার তাদেরকে তুলে দিয়েছিল আইএস এর হাতে। পালিয়ে যাওয়া যৌনদাসীদের ধরিয়ে দিলে আইএস তাদের পাঁচ হাজার ডলার(প্রায় চার লাখ টাকা) পুরস্কার দেয়।

কেউ সেটা করেছিল নিজেরা আইএস এর সমর্থক হওয়ার কারণে। কেউ করেছিল পুরস্কারের লোভে, আর কেউ করেছিল ভয়ে। পাছে প্রাণটা না হারায়।

কিন্তু ওমর এবং তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে অসহায় ইয়াজিদি মেয়েটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলছিল কীভাবে আইএসের জঙ্গিরা তাকে যৌন দাসী হিসেবে বারবার বিক্রি করছিল আর তার উপর চলে আসছে পাশবিক নির্যাতন। তখন ওমর কিংবা তার বাবার একবারও মনে হয়নি মেয়েটাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা।

মুহুর্তের মধ্যেই তারা সিদ্ধান্ত নেন নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও তারা মেয়েটিকে বাঁচাবে। সেই মেয়েটি আর কেউ নন, এ বছরে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া নাদিয়া মুরাদ।

নাদিয়া মুরাদ হলেন সেই ইয়াজিদী কিশোরী, যিনি আইএসের বন্দী শিবির থেকে পালিয়ে আসার পর হাজার হাজার নির্যাতিতা নারীর মতো চুপ করে না থেকে সোচ্চার হয়েছিলেন আইএসের বর্বরতার বিরুদ্ধে।

আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার চালিয়েছিলেন তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য। এবং তার সাহসীকতার স্বীকৃতি হিসেবেই প্রথমে তিনি নিযুক্ত হয়েছিলেন জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে এবং পরবর্তীতে অর্জন করেছেন নোবেল পুরস্কার।

তার নির্যাতিত হওয়ার এবং সাহসী ভূমিকার গল্প গণমাধ্যমের কল্যাণে কারো আর অজানা নেই।

কিন্তু অধিকাংশ মানুষের কাছেই অজানা রয়ে গছে নাদিয়ার জীবন বাঁচানো ওমর আব্দুল জবারের সাহসী কাহিনী। মসুল ছেড়ে আইএসের চোখ ফাঁকি দিয়ে নাদিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন এই জব্বার।

আর সেই নাদিয়াকে বাঁচাতে গিয়ে, তাকেই  আজ আইএসের কবল থেকে বাঁচার জন্য দেশ ছাড়তে হয়েছে।

দুজনের পথ পুরোপুরি দুদিকে বেঁকে গেছে। তা নিয়ে আর ভাবার অবকাশ নেই। নাদিয়া যেখানে হয়ে উঠেছেন সাম্প্রতিক বিশ্বের সবচেয়ে সফল নারী, সেখানে চার বছর পর এখনও হত্যার হুমকি মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ওমর। জামার্নির এক রুমের অ্যার্পাটমেন্টে কোন মতে দিন গুজার করছেন।

নাদিয়াকে সেদিন ঘরে লুকিয়ে রাখা ওমরদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কিন্তু তাকে বের করা ছিল আরো ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ হয়ত দেখে ফেলছে, এরকম সন্দেহে তাকে শহরের অপর প্রান্তে ওমরের চাচাতো বোনের বাসায় রেখে আসেন।

 

 

নাদিয়া তার বইতে লিখেছেন, ‘ যেরাতে আমি ওমরের বাড়িতে এলাম, পরদিন ঘুম থেকে উঠে আমার প্রথম যে কথাটি মনে হয়েছিল তা হল- আমাকে বাঁচতে হবে। ’

মসুলে যেসব ইয়াজিদি মেয়েরা আইএসের কবলে পড়ে পালিয়ে যাওয়া চেষ্টা করতো বা কোন পরিবারের কাছে আশ্রয় তারা তাদেরকে আইএসের কাছে ফিরিয়ে দিতো।ওমরের অনেক প্রতিবেশি ছিল যারা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে অর্থে অভাবের কারণে এমন সব মেয়েদের আইএসের কাছে ফিরিয়ে দিতো সেই ৫ হাজার ডলার পুরস্কার কুড়াতে।

পালিয়ে যাওয়ার সেই দুঃসাহসিক গল্প

নাদিয়াকে ওমরের পরিবার চিলেকোঠার জানালা কাছেও ঘেষতে মানা করেছিল। যাতে কেউ দেখে না ফেলে।

ওমরের এক চাচাতো ভাই নাদিয়া নামে সুন্নি মুসলিম হিসেবে মানানসই নাম দিয়ে একটি নকল পরিচয়পত্র তৈরি করেন।

 

 

সেখানে নাদিয়ার নাম দেওয়া হয় সুজান এবং তার ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয় ১৬০ কিলোমিটার দূরবর্তী শহর কিরকুরের নাম। নাদিয়ার পরিচয় হয় ওমরের স্ত্রী। নাদিয়া সারা রাত জেগে তার নতুন নাম, পরিচয়, সাজানো গল্প বারবার মুখস্ত করেন। সামান্য একটু ভুলও হতে পারে তাদের মৃত্যুর কারণ।

নির্দিষ্ট দিনে জব্বার তার সাজানো স্ত্রী নাদিয়াকে নিয়ে  মসুল ছেড়ে যাত্রা শুরু করেন। আর সেই যাত্রা যেন আজও থামেনি জব্বারের জীবনে।সেদিন প্রথম চেকপয়েন্টেই তাদের গাড়ি থামানো হয়। আইএস সদস্যরা গাড়ি তল্লাশি কতে শুরু করে । তারা ওমর আর নাদিয়ার কাগজপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে পরীক্ষা করে এবং ওমরকে জেরা করতে থাকে- সাথে কে, কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কবে ফিরবে ইত্যাদি।

গল্প আগে থেকেই সাজানো ছিল। ওমর উত্তর দেন, স্ত্রীকে নিয়ে তার বাবা-মাকে দেখতে কিরকুর যাচ্ছেন। সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে অবশেষে আইএসরা তাদেরকে ছেড়ে দেয়।

পুরো সময়টা নাদিয়া নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে ছিলেন। কারণ চেক পয়েন্টে যখন গাড়ি থামানো হয়েছিল, তখনই তার চোখে পড়েছিল সাইনবোর্ডের উপর। সেখানে অন্য দুটি মেয়ের সাথে ওয়ান্টেড তালিকায় স্থান পেয়োছল তার ছবিও। আইএস সদস্যরা যদি তার নিকাব সরাতে বলতো, তাহলে তিনি ধরা পড়ে যেতেন।

এছবিটা তোলার সময় ওমর ততক্ষণে নিরাপদ আশ্রয়ে নাদিয়াকে তুলে বাড়ি পথে রওয়ানা হয়েছেন।

কিন্তু যে কঠোর ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে আইএস তাদের অন্যায়গুলোকে বৈধতা দেয়, তার কল্যাণেই হয়ত শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সবগুলো চেকপয়েন্টের কোনোটিতেই তাকে সারাতে বলেনি কেউ। সেই অর্থে আইএসের নিয়মে আইএস বাধা পড়ে যাওয়ায় পথ খুলে গেছিল নাদিয়ার।

শেষপর্যন্ত কোনো ঝামেলা ছাড়াই নাদিয়াকে নিয়ে আইএসের এলাকা থেকে বিরিয়ে কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পৌঁছে দেয় ওমর।

সকালে ইরাকি কুর্দিস্থানের রাজধানী ইরবিলের একটি হোটেলে তিনি নাদিয়াকে তুলে দেন কুর্দি কর্তৃপক্ষের কাছে। এরপর আবার মাঝরাতে ফিরে আসেন মসুলে, নিজের পরিবারের কাছে। সবার আড়ালে।

কিন্তু দুদিন পর আবার যখন মাঝরাতে তাদের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ার ভারী শব্দ হয়। তারা বুঝতে পারেন এবার আর পালিয়ে আসা কোনো মেয়ে নয়, এবার দরজায় এসেছে খোদ আইএস, ওমরকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

কোনোভাবে তারা জেনে গেছে নাদিয়ার পালানোর কথা এবং তাকে পালাতে সাহায্য করার ব্যাপারে ওমরের ভূমিকার কথা।

ওমরের বাঁচার একটাই উপায় ছিল।পালিয়ে যাওয়া।

জানালা দিয়ে তিনি প্রতিবেশীর বাসায় ছাদে লাফিয়ে পড়েন। সেখান থেকে অন্যপাশের গলি দিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেন এক বন্ধুর বাড়িতে।

ওদিকে তার বাবা-মা অনেক বাদানুবাদের পর আইএস সদস্যদেরকে বোঝাতে সক্ষম হর যে, নাদিয়াকে পালাতে সাহায্য করার ব্যাপারে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, যা করার ওমর একাই করেছে।সে ওই মেয়ের প্রেমে পড়েছে।

আর সেই জন্য আইএসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি হিসেবে তারা ওমরকে ত্যাজ্য করার ঘোষণা দিয়েছে।

সে যাত্রায় নিজেদেরকে রক্ষা করেন ওমরের পরিবার।

এরপর ওমর যা পেলেন

তিন বছর বাদে যখন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক পত্রিকা টাইমস এর দল মসুলে ওমরের বাড়িতে আসে তার বাবার সঙ্গে কথা বলতে তখন তিনি জানান, কিভাবে তার ছেলেটি জানালা গেলে অজানা পথে পাড়ি দিয়েছিল শুধুই একটি অসহায় ইয়াজিদি মেয়েকে বাঁচানোর কারণে।

ওমরের বাবা বলেছেন, ‘ আমরা জানতাম আমরা ঠিক কাজটি করেছি।হয়তো এটা জানতাম না পরিণতি কষ্টদায়ক হবে এতোটা। কিন্তু এখনও বিশ্বাস করি ঠিক কাজটি করেছি।’

ওমর বলেছে — বন্ধুর বাসায় লুকিয়ে থাকতে হয়েছে বেশ কদিন।

ওমর আরেক বন্ধু এবং নিজের এক চাচার কাছ থেকে ৭ হাজার ডলার ধার করেন। তিনি তার স্ত্রী এবং পুত্রকে নিয়ে খালি গ্যাস ট্যাংকারের ভেতর লুকিয়ে মসুল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন । কিন্তু শেষপর্যন্ত তার গর্ভবতী স্ত্রী এবং শিশুপুত্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তাদেরকে ছাড়া তিনি নিজেই মসুল ত্যাগ করেন।

ততদিনে ইরাকের অন্য অনেক অংশও আইএসের দখলে চলে গেছে। ফলে ইরাক ছেড়ে ওমর প্রথমে তুরস্কে এবং পরে বুলগেরিয়া চলে যান। কিন্তু ওমরের বীরত্ব বা ইরাকে তার জীবনের ঝুঁকির মূল্য বুলগেরিয়ার পুলিশের কাছে ছিল না। বুলগেরিয়ায় তার স্থান হয় পুলিশ হেফাজতে।

ওমর যখন বুলগেরিয়ার জেলে , ততদিনে নাদিয়া ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। তিনি তার দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরতে শুরু করেন, আইএস সদস্যদের বিচারের দাবি করতে শুরু করেন। ইরাক ছাড়িয়ে তার সাহসী কন্ঠস্বর পৌঁছাতে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।

জার্মাানর একটি সংগঠনের উদ্দ্যোগে আইএসের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া হাজার ইয়াজিদি নারীর সাথে জার্মনির যাওয়ার সুযোগ পান তিনি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে তিনি নারীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে নিয়োগ পান।

২০১৫ সালের মার্চ মাসে ইরাকে তার জীবন নিরাপদ না, এই কারণটি দেখিয়ে ফের জার্মানিতে আশ্রয় প্রার্থনা করেন ওমর। কিন্তু সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সে আশ্রয় তিনি পাননি। জার্মানি তাকে অস্থায়ী ভিসা প্রদান করেছে, কিন্তু এ বছর সেই ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভাগ্যে কী ঘটবে, সেটা এখনও জানেন না ওমর।

বর্তমানে ওমর থাকেন জার্মানির তোরগাউ শহরে এক রুমের একটি অ্যাপার্টমেন্টে। সেখান থেকে প্রতিদিন ভিডিও কলে মসুলে পরিবারের সাথে কথা বলেন তিনি।

তার স্ত্রী রানদা তার ছোট ছেলে ইয়াহইয়াকে ফোনের স্ক্রিনের সামনে দাঁড় করিয়ে বলেন, “বাবাকে হাই বলো”।

কিন্তু তিন বছর বয়সী ইয়াহইয়া কিছু বলে না, শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবার সামনে সে অস্বস্তি বোধ করে। জন্মের পর থেকে তার বাবার সাথে তার কখনো সরাসরি দেখাই হয়নি।

মাঝেমাঝে সে পাল্টা প্রশ্ন করে — তুমি কি আমার বাবা?

মসুল আইএস মুক্ত হয় ২০১৭ সালে, কিন্তু অনেক ধ্বংসযজ্ঞের বিনিময়ে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনীর আক্রমণে মসুলের একটা বড় অংশ পরিণত হয় ধ্বংস্তুপে।

আইএসের উপর আক্রমণ করতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এং ইরাকি সেনাবাহিনী শহরের ভেতরে থাকা বেসামরিক জনগণকে রক্ষা করার খুব বেশি চেষ্টা করেনি।

শহরের এক প্রান্তে যে বাড়িটিতে ওমর শেষ কয়দিন নাদিয়াকে লুকিয়ে রেখেছিলেন, আইএসের ঘাঁটি সন্দেহে সেই বাড়িটির উপরেও বিমান হামলা চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

নিহত হয় ওমরের বোনের পরিবার ।

ওমরের স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মা এবং ভাই-বোনেরা এখনও নিরাপদে আছেন, কিন্তু তারা এখনও আইএসের প্রতিশোধের ভয়ে ভীত।

আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাক আইএস মুক্ত হয়েছে ঠিকই। কিন্তু স্থানীয় যেসব যুবকরা আইএসে যোগ দিয়েছিল, তাদের সবাই নিহতও হয়নি, গ্রেপ্তারও হয়নি। অনেকেই এখনও আত্মগোপনে আছে। তাদের স্লীপার সেলগুলো এখন সুপ্ত আছে।

ওমরের পরিবারের ভয়, সুযোগ পেলেই তারা হয়তো ওমরের উপর এবং তাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

জার্মানীতে ওমরের ঘর

তাদের ভয় খুব একটা অমূলকও না। ওমরকে ধরতে যে প্রথমবার আইএস অভিযান চালিয়েছিল, সেটা ওমরের পরিচিত স্থানীয় কারো দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই চালিয়েছিল।

নাদিয়াকে নিয়ে ওমর যখন কুর্দিস্তানে প্রবেশ করেছিলেন, তখন কুর্দি গোয়েন্দারা তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ভিডিও ধারণ করেছিল। পরে সেই ভিডিও তারা স্থানীয় টিভি চ্যানেলে প্রচার করে।

ওমরের চেহারা যদিও তারা অস্পষ্ট করে দিয়েছিল, কিন্তু মসুলে ওমরের পরিচিত কেউ তাকে চিনে ফেলে আইএসকে জানিয়ে দেওয়ার ফলেই তারা এত তাড়াতাড়ি তার বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পেরেছিল। সেই ভয় ওমরের পরিবারের এখনও আছে।

ওদিকে জার্মানিতে বসেও ওমর নিরাপদ নেই। গত বছরও তার মোবাইল ফোনে মেসেজে হুমকি এসেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, আইএস জানে তিনি কোথায় আছেন এবং তারা তার উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আসছে।

ওমর মোবাইল নাম্বার পাল্টে ফেলেছেন, কিন্তু তার আতঙ্ক কাটেনি। ক্লাস ছাড়া বাইরে কোথাও যাওয়ার সাহস পান না তিনি।

স্ত্রী-পরিবার ছাড়া হতাশাময়, একঘেঁয়ে জীবন কাটে তার। তার এক বন্ধুর বর্ণনা অনুযায়ী, অন্তত দুবার তিনি ওমরকে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে এনেছেন।

তারপরেও ওমর আব্দুল জাবার তার সেই রাতের সিদ্ধান্ত নিয়ে আফসোস করেন না। তিনি মনে করেন, নাদিয়াকে বাঁচানোর জন্য তিনি যা করেছেন, সেটাই ঠিক ছিল।

তিনি বলেন, নাদিয়ার এবং তার পরিবারের জীবিত সদস্যদের মুখে এখন যে হাসি, তার জন্য যে কারোই উচিৎ ছিল তার জীবন রক্ষা করা।

নাদিয়া তার পরিবারকে ফেরত পেয়েছে, বিশ্বে এতো নাম কামিয়েছে সবটাই তাকে আনন্দ দেয়।নাদিয়ার বাগদানের খবর পেয়ে দারুন খুশি ওমর।

ওমর জানায়, ‘আমার আনন্দ ও শান্তি এখানে, আমার কারণে কারো জীবন আবাদ হয়েছে। কেউ বেঁচে আছে। আমার সন্তান নিশ্চয় সেজন্য তার বাবাকে নিয়ে অহঙ্কার করবে।’

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

লিভারপুল দুর্দান্ত এক মৌসুম পার করছে। যেখানে প্রিমিয়ার লিগে একের পর এক ম্যাচে জিতে চলেছে... আরও পড়ুন

প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে

ভোলার বোহানউদ্দিনে আজ ‍রবিবার দুপুরে সংঘর্ষের ঘটনাটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন—একটি হিন্দু ছেলের ফেইসবুক... আরও পড়ুন

ছেলের ফেইসবুক আইডি

সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়দের একজন লিওনেল মেসি। ক্লাব ফুটবলের হয়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন... আরও পড়ুন

বার্সেলোনার হয়ে

  নির্ধানিত ১২০ ঘন্টা যুদ্ধবিরতির পর কুর্দি যোদ্ধারা যদি প্রস্তাবিত নিরাপদ এলাকা ছাড়তে না চায়... আরও পড়ুন

দেবেন বলেন হুঁশিয়ারি

ক্যাসিনো কান্ডের সঙ্গে জড়িত না এমন কাউন্সিলরদের হয়রানি না করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার... আরও পড়ুন

রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি

তালিকা থেকে মৃত ভোটারদের কর্তন করা এক একটা সমস্যা বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)... আরও পড়ুন

ভোটার একটা

এবারকার ব্যাটম্যান সিরিজে দেখা যাবে টোয়াইলাইট খ্যাত অভিনেতা রবার্ট প্যাটিনসনকে।ম্যাট রিভসের পরিচালনায় কেপড ক্রুসেডর সিনেমাটিতে... আরও পড়ুন

ভোলার বোরহানউদ্দিনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত হয়েছে।গুলিবিদ্ধ আরও নয়জনকে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল... আরও পড়ুন

বাংলা মেডিক্যাল কলেজ

দারুণ এক ম্যাচে দুই গোল আদায় করে জয় তুলে নিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের... আরও পড়ুন

হারিয়েছে ২-০ গোলের

লা লিগায় বড় ধরনের বিপদে পড়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। তারা হেরে গেছে রিয়াল মায়োর্কার কাছে। যে... আরও পড়ুন

শীর্ষ স্থান থেকে নিচে

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Recommended for you

রাজধানীর সায়েন্স

গাড়ির চাকা ফাটলেও কী আইএসের হামলা বলতে হবে: তথ্যমন্ত্রী

রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পুলিশের ওপর হাতবোমা হামলার ঘটনা নিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, বাংলাদেশে আইএস এর কোনো অস্তিত্ব নেই। কোনো ঘটনার পর আইএসের দায় স্বীকারের দাবি কোত্থেকে কীভাবে আসে, সে... আরও পড়ুন

মুখে কুলুপ এঁটে আছেন মুতাজ

সিরিয়া থেকে বাংলাদেশে আসা সন্দেহভাজন আইএস জঙ্গি আবদুল মজিদ মুতাজের বাংলাদেশে আসার উদ্দেশ্য কী তা এখনো তার মুখ থেকে বের করতে পারেনি গোয়েন্দারা। বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম... আরও পড়ুন

আইএসে যোগ দিয়ে যুদ্ধও করেছেন মুতাজ

ঢাকায় গ্রেফাতার হওয়া সিরিয়া ফেরত বাংলাদেশি মুতাজ আবদুল মজিদ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের হয়ে সিরিয়ায় যুদ্ধ করেছিলেন। মজিদ ২০১৬ সালে তুরস্ক যান। সেখানেই তার সঙ্গে আইএসের যোগাযোগ হয়। এর প্রায়... আরও পড়ুন

২০১৪ সালের নির্বাচনের পাঁয়তারা করছে সরকার:: ফখরুল

সরকার ২০১৪ সালের মতো এবারও একতরফা নির্বাচনের পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠনটির নেতা-কর্মীদের নিয়ে ঢাকার শেরে বাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল শ্রদ্ধা নিবেদনের পর এ... আরও পড়ুন