ব্রিটিশ-বাংলাদেশী আইএস বধূর কাহিনী

রিডার::যুক্তরাজ্য

রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৭:৩৪:৫৩ অপরাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  
থেকেই নিজেকে ইংরেজ

আশির দশকের শুরুর দিকে কথা। উত্তর লন্ডনে আর দশটা সাধারণ বাঙ্গালি পরিবারে জন্ম নেওয়া তানিয়া জয়া। শুরু থেকেই নিজেকে ইংরেজ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার পরিবারের চাপ ছিল ‘ভালো মুসলিম মেয়ে’ হিসেবে বেড়ে উঠার। সঙ্গত কারণেই তিনি পশ্চিমা সমাজের সঙ্গে মেশার খুব একটা সুযোগ পাননি।

ভালবেসে বিয়ে করেন মার্কিন যুবক জন জর্গেলাসকে। সংসার শুরু করার পর তানিয়া জানতে পারেন তার অর্ধাঙ্গ একজন আইএস জঙ্গি।

জিহাদি স্বামীর আর সন্তানের সঙ্গে তিনি চলে যান সিরিয়ায়। সেখান থেকে ফিরে যান যুক্তরাষ্ট্রে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কিভাবে ফিরে এলেন সেটি  ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের কাছে তানিয়া তুলে ধরেছেন। সেই অভিজ্ঞতা তার জবানিতেই ভাষান্তর করে পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।

১৯৮৩ সালের কোন একটি চমৎকার দিনে উত্তর লন্ডনে আমার জন্ম।আমার বেড়ে ওঠাও সেখানে। সাধারণ বাঙ্গালি, বাংলাদেশি মধ্যবিত্তের পরিবার ছিল আমাদের। কিন্তু আমি সব সময় চেয়েছি ইংরেজ হিসাবে চলতে। পরিবার সেই প্রশ্রয় কখনই দেয়নি।তারা চাইতো আমি যেন বাকীদের মতো ‘খুব ভালো মুসলিম নারী’ হিসাবে পরিণত হই।

পশ্চিমা সমাজকে এড়িয়ে চলি, এমনটাই প্রত্যাশ ছিল আমার পরিবারের– আমার কাছে।কিন্তু সেটি আমি চাইনি।বাবা-মায়ের উপর আস্থা হারিয়ে যাচ্ছিল।এক পর্যায় আমার জীবন এলোমেলো মনে হচ্ছিল।

আমার বয়স যখন ১৭ বছর, তখন আমরা পূর্ব লন্ডনে চলে আসি। নতুন করে আমার অনেক বন্ধু হয়েছিল, কিন্তু তারা ছিল রক্ষণশীল, ধর্মাচারী। আমার খুব বেশি পশ্চিমা হওয়াকে তারা বাঁকা চোখে দেখত। আমি তখন এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম যে আমি নিজেকে বদলে ফেলতে চেয়েছিলাম।

আমার উপর যার খুব বেশি প্রভাব ছিল, আমার সেই কাজিন (মেয়ে) বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে উগ্রবাদে ঝুঁকে পড়েছিলেন। তিনি আমাকে খেলাফতের বিষয়ে পাঠ দিতেন। আমি নিজেও অনলাইনে প্রচুর সৌদি ইসলামি ফতোয়া পড়তাম আর ভাবতাম, সত্যের সন্ধান করছি।

২০০৩ সালের মার্চে লন্ডনে ইরাক যুদ্ধবিরোধী একটি মিছিলে আমি অংশ নেই। সেইটি আমার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেখানে এক লোক আমাকে এক টুকরা কাগজ দেয়, যাতে একটি মুসলিম ‘ডেটিং ওয়েবসাইটের’ নাম লেখা ছিল। সেখানেই নবদীক্ষিত মার্কিন মুসলিম জন জর্জেলাসের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়।

মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া বহুভাষী এই তরুণকে বেশ চৌকস মনে হয়েছিল। তাকে আমি ভালবেসে ফেলি।

লন্ডনে জনের প্রথম সফরেই আমি তাকে বিয়ে করে ফেলি। কারণ, তখন এটা ছাড়া বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার অন্য কোনো উপায় ছিল না। কিছুদিন পর আমরা যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাই এবং আমাদের প্রথম ছেলের জন্ম হয়।

আমি তখন নেকাব পরা বন্ধ করেছিলাম ও স্বাধীন হয়ে উঠছিলাম, অন্য দিকে জন ঠিক ততোটাই কট্টরপন্থী হয়ে উঠছিল। ২০০৬ সালে ইসরায়েলপন্থী একটি লবিং গ্রুপের ওয়েবসাইট হ্যাক করায় দায়ে জনের তিন বছরের কারাদণ্ড হয়।

আমি তখনও আর্থিকভাবে তার উপর নির্ভরশীল ছিলাম। বুঝতে পারিনি যে আমি নিপীড়নমূলক বিয়েতে আটকে আছি।

জন কারামুক্ত হওয়ার পর তিন সন্তানকে নিয়ে আমরা প্রথমে মিশর ও পরে ইস্তাম্বুল চলে যাই। সে সিরিয়ায় যাওয়ার কথা তুললেও, আমি বাচ্চাদের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে না নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনড় ছিলাম। যদিও তখন ইস্তাম্বুলে থাকার সামর্থ্য আমাদের ছিল না।

জন আমাকে ও যুক্তরাষ্ট্রে তার পরিবারকে বলেছিল, আমরা তুরস্কের আন্তাকিয়ায় চলে যাচ্ছি। কিন্তু আসলে আমরা সরাসরি চলে গেলাম সিরিয়ার সীমান্তে।

মধ্যরাতে আমরা যখন একটি বাস ধরলাম তখনও আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না যে কী ঘটতে যাচ্ছে?

আমি তখন পাঁচ মাসের গর্ভবতী, বাচ্চাদের নিয়ে একটু বসে ঘুমাতে পেরেই স্বস্তি পেয়েছিলাম। ভোরের আলো যখন ঘুম ভাঙিয়ে দিল, তখন আমরা সিরিয়ার একটি তল্লাশি চৌকিতে।প্রথমেই কোনো ঝামেলা না করতে জন আমাকে সতর্ক করল।

একটা ফোন খুঁজে পেতেই আমি জনের মাকে সবটা খুলে বলি।তাকে জানাই, জন আমাদের কাছে মিথ্যা বলেছে। আতঙ্কে আমি কান্নাকাটি করছিলাম। তাকে অনুরোধ করি, বছরের পর বছর ধরে আমাদের পিছু নিয়ে থাকা এফবিআইয়ের এজেন্টদের সঙ্গে জন যেন যোগাযোগ করে।

পরে এফবিআই আমাকে বলেছিল, আমি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেলে আমার বিরুদ্ধে জিহাদি সংগঠনে যোগ দেওয়ার অভিযোগ আনা হবে না।

সিরিয়ায় আমাদের কোনও পানির ব্যবস্থা ছিল না। কারণ বাড়ির উপরের ট্যাংকটি গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে ছিল।

আমি অপুষ্টিতে ভুগছিলাম, আমার সন্তানেরাও। সিরিয়ায় সারাটাক্ষণ আমি বাচ্চাদের হারানোর ভয়ে ছিলাম। এফবিআই এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য জন আমাকে সারাটাক্ষণ দূষতো। আর আমি প্রতারণার করায় তার উপর খুব রেগেছিলাম।

এই সময়টায় আমি যেহেতু মুখ ঢেকে থাকতে রাজি হচ্ছিলাম না, জন আমাকে নিয়ে বিব্রতবোধ করত। আমাকে ছেড়ে চলে যেতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে তার জিহাদি বন্ধুরা তাকে চাপ দিচ্ছিলো।শেষ পর্যন্ত জনের মায়া হল, সে আমাদের চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করল।

যদিও সড়কে অবরোধ ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে আমাদেরকে তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছিল। জন আমাদের পরিবহনের জন্য একজন মানবপাচারকারীকে টাকা দিল। স্নাইপারের গুলির মুখে লাফিয়ে ট্রাকে উঠার আগে আমাদের কয়েক মাইল হেঁটে কাঁটাতারে ঘেরা গুহা পার হতে হয়েছিল।

আমাদেরকে বাস স্টেশনে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল পাচারকারীর, কিন্তু সেই লোক আমাদের সম্পূর্ণ অচেনা এক জায়গায় ফেলে রেখে লাপাত্তা হয়ে যায়। আমরা চরম দুর্দশায় পড়লাম, পরে এক তুর্কি আমাদের পথ দেখাল। বেঁচে থাকার জন্য আমি খুব কৃতজ্ঞ।

আমি চেয়েছিলাম, আমার সন্তানেরা ভাল থাকুক, তাদের জীবন পূর্ণ হোক এবং তারা পৃথিবীকে কিছু দিক।

খেলাফত প্রতিষ্ঠায় জন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এবং ইসলামিক স্টেটের শীর্ষস্থানীয় প্রচারক হিসেব পশ্চিমাদের মগজ ধোলাইয়ে আমি ভূমিকা রেখেছি।

আমার সঙ্গে জনের আর কখনও দেখা হয়নি এবং পরে জেনেছি, সে সিরিয়ায় আবার বিয়ে করেছে। গত বছর আমি জানতে পারি যে, তিনি মারা গেছেন। সম্ভবত ২০১৭ সালে মার্কিন বোমা হামলার সময় তিনি মারা যান।

এখন আমি টেক্সাসে জনের বাবা-মার বাড়ির অদূরেই থাকি। আমি জানি, কাছাকাছি থাকা তাদের ও শিশুদের জন্য ভালো। আমার বর্তমান স্বামী আমার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যত্ন শীল।

যুক্তরাজ্যের চরমপন্থাবিরোধী গোষ্ঠী ফেইথ ম্যাটার্সের সঙ্গে আমি কাজ করেছি। চরমপন্থা থেকে মুক্তির মূল চাবিকাঠি শিক্ষা: ডেটা, তথ্য ও বিজ্ঞান। এই বিষয়টাই আমাকে বদলে দিয়েছে; আমি প্রচুর পড়েছি, নিজেকে শিক্ষিত করেছি। শান্তিতে থাকতে হলে আমাদের মধ্যে সমমূল্যবোধ থাকতে হবে।

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

গুজবে কান দিয়ে রংপুরের যে যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেই শহিদুন্নবী জুয়েল আদতে ধর্মভিরু... আরও পড়ুন

আদতে ধর্মভিরু মুসলিম।

নভেম্বরের শুরুতেই নয়া প্রেসিডেন্ট পেতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডাকযোগে আগাম ভোট শুরু হয়েছে চলতি মাসে। এরই... আরও পড়ুন

ডাকযোগে আগাম ভোট

হাজী সেলিমপুত্র ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বহিস্কৃত কাউন্সিলর ইরফান সেলিম এবং তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ... আরও পড়ুন

মোহাম্মদ জাহিদের তিন

টানা দশ ঘণ্টা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে বসে আলোচনার পর আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির... আরও পড়ুন

যুদ্ধবিরতির বিষয়ে

হঠাৎ করে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক মাধ্যমগুলোতে উদ্বিগ্ন আমজনতা। চলছে আন্দোলনও। দাবি উঠছে সর্বোচ্চ শাস্তি... আরও পড়ুন

ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায়

প্রায় চার মাস বাদে পদ্মা সেতুর ৩২তম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান... আরও পড়ুন

উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কাস পার্টির ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একটি নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন করেছে... আরও পড়ুন

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পাঠানো একটি বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ধ্বংস করেছে সৌদি এয়ার... আরও পড়ুন

বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ধ্বংস

করোনা আক্রান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে দেশটির ঐতিহ্য অনুযায়ী নির্বাচনী বিতর্ক... আরও পড়ুন

নির্বাচনী বিতর্ক

পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে চার শিশুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের... আরও পড়ুন

ধর্ষণের অভিযোগে চার শিশু

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।