বিটোভেনের ঘরে

রিডার:: তারেক অণু

শুক্রবার, ২ নভেম্বর, ২০১৮ ০৬:১৩:২১ অপরাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  
সাবেক পশ্চিম

সাবেক পশ্চিম জার্মানির রাজধানী ক্ষুদে শহর বন।শহরটি ইতিহাস খ্যাত নদী রাইনের পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠেছে। খুব ছোট থাকতে, যখন বনে’র নাম শুনেছিলাম, আমার সেই কচিমনের কল্পনায় ভেসে উঠত গাছ-গাছালি ছাওয়া কোন জঙ্গুলে জায়গার কথা। তখনতো আর জানা ছিল না এই শহরের নামে বানানো হবে `BONN’। মানে এই বন আর জঙ্গলের সেই বন এক নয়।

বন সম্পর্কে এত উৎসাহের অন্যতম প্রধান কারণ-সৈয়দ মুজতবা আলী। কিংবদন্তীর এই পর্যটক লেখকের জীবনের এক উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে এই শহরে, তার অতুলনীয় ক্ষুরধারে লেখনীর আদি ও অকৃত্রিম ভক্ত হবার কারণে বনের কোন রাস্তায় সৈয়দ মুজতবা আলী প্রতিদিন চলাচল করতেন, কোন ক্যাফেতে আড্ডা দিতেন, রাইনের তীরে কোন গাছের ছায়ায় বসে সাহিত্য চিন্তায় মগ্ন থাকতেন — সবই তার রসময় লেখা বারংবার পড়ে মোটামুটি জানা হয়ে গিয়েছিল। তাঁর স্বচ্ছ লেখনীর জলবতী ধারা অনায়াসে চোখের সামনে তৈরি করত সেই অদেখা শহরের পথঘাট, রাস্তা, গলি, উপগলি। ভালবেসে ফেলেছিলাম সেখানকার সবকিছুকেই আর প্রতিটি অধিবাসীকে।

তবে বন সম্পর্কে আগ্রহের সত্যিকারের মূল কারণ, সুর সম্রাট বিটোভেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে কেবল মাত্র মোজার্টের সাথে যাঁর তুলনা চলে, সেই ল্যুদভিগ ফন বিটোভেন জন্ম নিয়েছিলেন এই শহরে। এইখানেই অতিবাহিত হয়েছে তাঁর শৈশব, এখানকার জল, বাতাস, সজীব প্রকৃতিতেই অমরত্বের পথে এগিয়েছেন এই মহান শিল্পী।

সদর দরজায় বিটোভেনের খোদাই করা নাম

 

তিনি যে বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যে ঘরে বিশ্বের সমস্ত সুরঝঙ্কার নিয়ে তার প্রথম আগমন, তা এখনও সেই একইভাবে রাখা আছে।

দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে সেই বাড়িকে, যা আজ সমগ্র পৃথিবীর শত কোটি সুর, সঙ্গীত আর বিটোভেন ভক্তদের কাছে তীর্থ স্থানে পরিণত হয়েছে। সেই তীর্থ যাত্রার কথাই বলব আজ আপনাদের-

বিটোভেন সম্পর্কে দুই লাইন-
১৭৭০ সালে বনের এই বাড়িতে বিটোভেনের জন্ম, তার বাবা জোহানও ছিলেন একজন সুরকার। খুব ছোট বেলা থেকেই তাঁর মাঝে সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তুলনাহীন প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটতে থাকে। তরুণ বয়সে বিটোভেন তখনকার সময়ে সুরকারদের মক্কা খ্যাত ভিয়েনায় বসবাস শুরু করেন, যেখানে তার পেশাদার সঙ্গীত জীবনের শুরু।

অত্যন্ত দুঃখজনক ভবে মাত্র ২৬ বছর বয়সে তার কান ও অন্যান্য শ্রবণ যন্ত্রে জটিল রকমের সমস্যা দেখা দেয় যা তাঁকে ধীরে ধীরে বধিরতার দিকে নিয়ে যায়। ১৮১৪ সালে নিয়তির অবশ্যম্ভাবী পরিহাসে বিটোভেনের শ্রবণ ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে লোপ পায়, কিন্তু প্রকৃতির বিস্ময় এই মহান সুরকারের শুদ্ধ সঙ্গীতের সাধনা থেমে যায়নি তাতে।

সেই  সময় কানে দেবার কিছু চোঙ জাতীয় যন্ত্রের সাহায্যে তাঁর নিরন্তর শিল্প সৃষ্টির মাধ্যমে অমরত্বের পথে যাত্রা অব্যাহত থাকে।

 

 

সত্যিকারের সঙ্গীত প্রতিভা বলতে কি বোঝায় তা বিটোভেন সৃষ্ট সঙ্গীত শুনলে বোঝা যায়। এজন্য আপনার কোনো সমঝদার বা তাল-লয় বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন নেই। শুধু মনের মাঝে একটু কোমল অনুভুতি, জীবনের প্রতি একটু ভালবাসা, সুন্দরের প্রতি সামান্য আগ্রহ-ব্যস!

প্রবল বিস্ময়বোধে আক্রান্ত হতে হয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের শত কোটি মানুষকে সুরমুর্ছনার ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন করে রাখা এই সুরকার তার নিজের অনেক অমর সৃষ্টিই কোন দিন নিজ কানে শুনতে পারেননি।

 

 

তার অন্যতম সেরা সৃষ্টি ৭ম আর ৯ম সিম্ফনি প্রায় বধির অবস্থায় রচিত, যা একই সাথে তার প্রতি শ্রদ্ধায় আমাদের মাথা নত করে দেয় আর প্রকৃতির খাম-খেয়ালিতে পর্যুদস্ত এই প্রতিভার জীবন আর সঙ্গীতের প্রতি ভালবাসা অপার মুগ্ধতায় ভরিয়ে তোলে। ১৮২৭ সালে ভিয়েনায় এই সুর সম্রাটের জীবনবসান ঘটে।

বিটোভেনের বাড়িতে
অবশেষে রাইন পেরিয়ে বন অল্পক্ষণ ঘুরে সোজা চলে গেলাম বিটোভেনের বাড়িতে। ভবনের প্রধান দরজায় জার্মান ভাষায় তার নাম লেখা।
অত্যন্ত যত্ন নিয়ে সংরক্ষিত প্রতিটি কক্ষ, জাদুঘরের টিকিট কেটে সেই অদ্বিতীয় সংগ্রহশালার বিভিন্ন ঘর ঘুরতে ঘুরতে চলে গেলাম উপর তলায়, যেখানে তার জন্মস্থান।

যে ছোট্ট ঘরটিতে বিশ্বনন্দিত সুরকার জন্মে ছিলেন সেখানে অজানা কারণে কোন ছবি তোলা নিষেধ, কেন তা বোধগম্য হল না, কিন্তু ঘরটিতে দরজা খোলা বিধায় দর্শনার্থীরা মনের আশা মিটিয়ে সুরসম্রাটের জন্মস্থানটি অন্তত অবলোকন করতে পারেন।

 

বাড়ির ভেতরের এই জাদুঘরে আছে বিটোভেনের ব্যবহৃত পিয়ানো

কাঠের সেই কামরাটিতে উঁকি দেবার সাথে সাথেই সারা শরীর রোমাঞ্চে কাটা দিয়ে উঠল, শুধুমাত্র স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে রইলাম মাত্র। একবার মনে হল সংজ্ঞা লোপ পেতে যাচ্ছে হয়ত আমার ।

পাশেই দাঁড়ানো বন্ধুদের কোনো কথাই কানে প্রবেশ করছে না। মাথায় শুধুই লক্ষ হাজারবার শোনা বিটোভেনের ৫ম,৭ম আর ৯ম সিম্ফোনি ঘুরে ঘুরে আসছে।

অবাক হয়ে ভাবছি, এই ঘরেই সেই শিশুটির জন্ম-প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই কান্নাভরা চিৎকারে নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়েছিল যে ,বার্তা পৌঁছেছিল আমি এসেছি!  কোটি কোটি মানুষের মত কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে নয়, মাথা উঁচু করে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকতে।

অনেকেই বিশ্বাস করেন, শব্দ হারিয়ে যায় না, কোন না কোন ভাবে প্রকৃতির মাঝে টিকে থাকে। ভবিষ্যতে যদি সেরকম যন্ত্র আবিষ্কার করা যায় তাহলে অতীতের সমস্ত কথাই হয়ত শোনা যাবে! বিশ্বাস হয় না, তারপরও মনে হচ্ছিল, ইস্ যদি এই মহান শিল্পীর জন্মক্ষণটিতে যাওয়া যেত, শোনা যেত তার প্রথম উচ্চারিত কন্ঠ! অবশেষে সঙ্গীদের ডাকে সম্বিত ফিরল।

 

বাগানের আবক্ষ ভাষ্কর্য

 

বিটোভেনের লেখা প্রায় ৫০০ চিঠির অমূল্য সংগ্রহ আছে এইখানে। আজীবন অকৃতদার এই অতি বিখ্যাতের চিঠি নিয়ে আজও গবেষণা চলে। নিষ্ঠাবান গবেষকদের আসা যদি কোনো অজানা তথ্য বেরিয়ে পরে, হয়ত গোপন কোন রোমান্স (বিটোভেনের অজানা কল্পিত প্রেম নিয়ে একাধিক কাহিনী সেলুলয়েডের ফিতেয় স্থান নিয়েছে)।

সুরকারের সংগ্রহিত সমস্ত স্বরলিপি সুন্দরভাবে সংরক্ষিত, সৃষ্টিশীল মনের অন্যতম পরিচায়ক অসংখ্য স্কেচও আছে সেইখানে।আর আছে বিটোভেনের রচিত সমস্ত সঙ্গীত।

দর্শকরা যে কেউ চাইলেই অডিও সেকশনে যেয়ে হারিয়ে যেতে পারবেন সেই অপার্থিব সুর মূর্ছনায়।

 

 

তার ব্যবহৃত শ্রবণে সহায়ক সেই যন্ত্রগুলো রাখা আছে পরম মমতায়, বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা তার পোট্রেট, আছে চেল্লো, বেহালা, পিয়ানোসহ নানা বাদ্যযন্ত্র। অবশেষে মন্ত্রমুগ্ধ মানুষের মত মাথার উপরে নীল আকাশ জোড়া রোদ

নিয়ে বিটোভেনের বাড়ির আঙ্গিনায় আমরা সবাই সেখানে একচিলতে বাগান, গোলাপের সমারোহ, এক কোণে শিল্পীর আবক্ষ ভাস্কর্য।

বন ছাড়ার আগে গেলাম বিটোভেনের হাউসের অদূরেই এক সবুজ মাঠে, যার মাঝে তার মুখমন্ডলের এক বিশলাকার অসাধারণ ভাস্কর্য, সম্পূর্ণটাই ধাতব পদার্থে তৈরি। একরাশ এলোমেলো চুল, চিরচেনা মুখভঙ্গী আর চোখের কোণে এক অজানা বিষন্ন ক্ষ্যাপা দৃষ্টি, যার মানে আজ পর্যন্ত আমরা কেউ-ই জানতে পারিনি।

 

 

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

নভেল করোনা ভাইরাসের প্রকোপের সময় যশোরের মণিরামপুরে মাস্ক না পরে বাইরে আসায় ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে... আরও পড়ুন

এসিল্যান্ডের নিগ্রহের

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নামই আছে তিনি অর্থের কাঙ্গাল।যে ক্লাব যতো দাম তুলবে তিনি সেই ক্লাবের।কিন্তু কভিড-১৯... আরও পড়ুন

ভাইরাসের প্রকোট যেন

  নভেল করোনাভাইরাসের প্রকটে গত কয়েক সপ্তাহে বেকায়দায় পড়েছে গোটা ইউরোপ।শুরুটা চীনে হলে গত কয়েক... আরও পড়ুন

কয়েক সপ্তাহে তা গোটা

কভিড-১৯ ভাইরাসে থমকে গেছে গোটা বিশ্বের মানুষের দৈনন্দিন জীবন। পর্যাপ্ত পরিমাণে কিট না থাকায় করোনাভাইরাস শনাক্ত... আরও পড়ুন

শনাক্ত করতে হিমশিম

কভিড-১৯ সংক্রমণের সিকি ভাগই মৃদু বা মাইল্ড অবস্থা থেকে এমনিতেই সেরে যায়।তবে এখনও পর্যন্ত ১৫... আরও পড়ুন

ভাইরাস সিভিয়ার পর্যায়

কভিড-১৯ ভাইরাসের আক্রমণে ধরাশায়ী গোটা বিশ্ব। আজ শনিবার পর্যন্ত নভেল করোনায় মৃতের সংখ্যা অন্তত ২৭... আরও পড়ুন

ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত

এক নভেল করোনাভাইরাসের ভয়ে বিশ্ববাসীর জীবন ওষ্ঠাগত। বাঘা বাঘা নেতাদের ঘায়েল করতে দ্বিধা করেনি কভিড-১৯... আরও পড়ুন

মাঝেই একটু সান্তনা

‘বাড়িত চাল নেই।বউ আছে, বাচ্চা আছে, আমিও তো আছি।রোগে সোগে আলাদা করি মরতে হবে না।... আরও পড়ুন

কথাগুলো বলছিলেন

জ্বর, সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত বগুড়ার শিবগঞ্জের এক মুদির দোকানি।গতকাল শুক্রবার রাতে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়া... আরও পড়ুন

নেওয়া চেষ্টা করেন তার

এক ক্যাটরিনা কাইফের জেরে নিজের বহুদিনের প্রেমিক রণবির কাপুরকে হারিয়েছেন বি-টাউন অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন। কাপুর... আরও পড়ুন

কাপুর খান্দানের চেরাগের

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।