বাক্সবন্ধী জীবন-১

রিডার::ফজলুল হক

মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট, ২০১৮ ০৬:০১:০০ অপরাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  

শেফা-মিতাকে ফোন করেছিলে?

মনি-মিতা খালাকে সকাল থেকে অনেক বার ফোন করেছি।ফোন তো ধরছে না।

শেফা- ফোন না ধরার কি আছে?তোমার বাবার খবরটা জানাতে হবে না ?

মনি-আবার দেখছি।হয় কী না।

বিরক্ত হয়ে বলল মনি। তার ছোট বাচ্চা। এতো কিছু দেখার সময় আছে।বাড়ি ভর্তি লোক।শ্বশুড় মশাই কাল রাত হঠাৎ করেই মারা গেছেন।কেন যে  এমন হল। বড় স্বল্পভাষী মানুষ। চাহিদা নেই। চোখে একটা নিরব ক্ষোভ নিয়ে চীরকাল বয়ে বেরিয়েছে যেন। গত চার বছরের তার বিবাহিত জীবনে কয়টা কথা তাকে বলতে শুনেছে সে গুনে বলতে পারবে। একটা সময় নাকি এমন ছিল না।মাঝ বয়সে মুখে কলুপ এঁটে, বসে থাকা শুরু করেছে।অবশ্যি তার তেমন ধারণা নেই।এ বাড়িতে আসার পর থেকে সে মানুষটাকে বই পড়তে দেখেছে শুধু।

শ্বাশুড়ি খাবারের জন্য ডাকলে সামান্য কিছু মুখে দিয়ে আবার বই পড়াতে মনযোগ দিতেন।কখনও কখনও তো সেই আরাম কেদারায় ঘুমিয়ে রাত পার………।বার কয়েকবার নিরবে চোখে পানি দেখেছে।শরীফকেও জানিয়েছে। শরীফ চুপ ছিল। বলেনি কিছুই।

কতো খুঁচিয়েছে। বলেনি…।সে নিজেই জানে কিনা সন্দেহ।

খুব ভোরে হাঁটতে বেরোতেন শ্বশুর মশাই।বাড়ি ফিরে আসতেই না আসতেই চা হাতে শ্বাশুড়ি অপেক্ষা করতেন।সঙ্গে একটা বাটার টোস্ট।ওই সকালে খেতেন।দুপুরে সারা বছর পাতলা আম ডাল, করোলার তরকারি আর লাল চালে দু‘নলা ভাত।রাতে মুরগির স্যুপ।এই চার বছরে ওই খেতে দেখেছে সে। পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাটের মেয়ে সে।এমন মানুষ জীবনে দেখেনি।

মাসের শুরুতে শ্বাশুড়ির হাতে একখানা চেক হাত ধরিয়ে দিতেন। তিনি নাকি অনেক বড় শেফ ছিলেন।  বিয়ের পর যেদিন প্রথম বাড়িতে এসেছে সেদিন একটা বেনারসি শাড়ি দিয়েছিলেন সঙ্গে একসেট গহনা।বলেছিলেন–নতুন বাড়িতে কিছু লাগলে শ্বাশুড়ি মাকে বলতে।তিনি নাকি ভাল মানুষ।ছাতা!

নিকুচি করি তোমার ভাল মানুষের। সব কাজ নিজ হাতে করেন মহিলা।এতো বড় আইনজীবী।সব কাজ নিজের করতে হবে! তার ছোট্ট এক রত্তির বাচ্চা। তারও সব কাজ নিজের হাতে করুক বলে তিনি চান!

শরিফের কাছে সে শুনেছে একটা সময় ছিল যখন বাড়িটা ‘ঘর’ ছিল।হঠাৎ করে কী যেন হল।বাড়ির সব মানুষেরা বড় নিশ্চুপ হয়ে গেল। যেন হঠাৎ করে আজরাইল এসে বলে গেছিল– সাবধান, কথা বললেই জীবন শেষ!

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আবার ফোনে চেষ্টা করলো।হল না। ভদ্র মহিলার কী হল, কে জানে।মিতা খালা বড় আলাপি, শ্বাশুড়ির স্কুলের বান্ধবি। সাধারণত ফোন করেই পাওয়া যায়। এ বাড়ির জন্য সব সময় চিন্তায় থাকেন।তবে খুব একটা বাড়িতে আসার সময় পান না। গানের স্কুল নিয়ে বড় ব্যস্ত থাকেন। তবে এ বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ কেন যেন তার নিজের। সারাবছর এটা-ওটা পাঠান ভদ্রমহিলা। বাবুর জন্য এ পর্যন্ত কত কী যে দিয়েছে!

এটা কেন করেন? আজকাল কে কার জন্য এতোকিছু করেন। কখনও ভাবেনি মনি।এতো ভাবার সময় কই ।তার ঘরে ছোট বাচ্চা!

ভাবতে ভাবতেই ঘরে ঢুকলো শরিফ।কাঁদতে কাঁদতে দুই চোখ ফুলে গেছে ব্যাঙ্গের মতো।শরীফকে দেখতে সব সময় মনে হয় ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার মতো দৌড়ে আছে। শতাব্দির ব্যস্ততম মানুষ।তার ছোট বাচ্চা।তার জন্যও সময়ই নেই! কিন্তু আজকে কেন যেন বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। হঠাৎ কী ভেবে  জিজ্ঞাসা করলো মনি, ‘তুমি মিতা খালাকে জানিয়েছো?’

শরীফ-জানিয়েছি, রাতেই।

মনি-ওমা! তো এখনও আসল না।মা বলল, লাশ দাফনের আগে ওনাকে জানাতে।

শরীফ-কিছু বলেনি।খবর শুনে ফোনটা রেখে দিল।তখন খেয়াল হয়নি। এখন মনে পড়লো।দাঁড়াও ফোন দেই।ঘুমোচ্ছিল হয়তো।

মনি-কাজ নেই।ফোন অনেকবার করেছি ।ধরছেই না।

দরজা কড়া নাড়ছে কেউ।মনি, শরীফের দিকে তাকাল।-যাও না, বাচ্চাটা তো উঠে পড়বে ঘুম থেকে।

শরীফ তাকালো একবার মনির দিকে।২০১৮ সালে ১৯১৮ সালের গতানুগতিক মা।বাচ্চা দিয়ে দিন শুরু, বাচ্চা দিয়ে ঘুমাতে যাওয়া।ঘুমের ঘরে বিছানায় হাত দিয়ে দেখে, মেয়েটা ভেজা কাপড়ে ঘুমিয়ে নেই তো।

দরজা খুলে শেফাকে দেখল, শরীফ।-কি হল মিতাকে পেয়েছো?

-ফোন ধরছে না তো।

শেফা-তাহলে কাউকে পাঠাতে হবে ওর বাড়িতে।তুমি যাবে? নিয়ে এসো। কুড়ি মিনিটের পথ।

শরীফ অবাক হয়ে তাকালো মায়ের দিকে।…….ঠিক কী বলছে বুঝতে পারছে না যেন।তার নিজের একমাত্র বাবা গতকাল মধ্য রাতে মারা গেছেন।বাড়িতে লাশ। একটু পরেই জানাযার জন্য নিয়ে যাওয়া হবে।সে যাবে মিতা খালাকে নিয়ে আসতে!

আজ বাড়িতে লোকজনের যেন শেষ নেই। তার বিয়েতেও এতো লোক সে দেখেনি। আজকাল তো আত্মীয়-স্বজনের থেকে ড্রাইভার, কাজের বুয়াই বেশি কাছে থাকে।প্রয়োজনে তারাই বড় কাছের মানুষ।

আগে মানুষ প্রতিবেশি-বন্ধুবান্ধবকে ভুলতে বসেছিল।আজকাল জীবন থেকে আত্মীয়-স্বজনরা হারিয়ে যাচ্ছে।

বড় মামা কোনায় বসে আছে, তজবি পড়ছেন । তার ছেলেটা থাকে লন্ডনে।মামির সকাল থেকে জ্বর। বাড়িতেই আছেন।হাতে থাকলো দাদি। তিনি তো বাবার থেকেও নিশ্চুপ মানুষ।

এই বাড়িতে মা আর সে ছাড়া আর কারও সঙ্গে তার কথা হয় না।

মনি কথা বলে, তবে ফোনে। আর তাও তার মায়ের সঙ্গে।

এ বাড়িটা যেন এক বরফ গলা নদী।

যেখানে সব আছে, যা কিছু প্রয়োজন ।শুধু আনন্দ আর হাসি মিলিয়ে গেছে। বেলুনের মতো।

মিনিট দশেকের মধ্যে শরীফ নিজেকে আবিস্কার করলো গাড়ির ড্রাইভিং সিটে।

উপায় নেই।

মিতা খালা, মায়ের ছোট বেলার বান্ধবি।খুব ছোট বেলায় একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখেছিল মিতা খালা বাড়িতে এসেছেন।উনি কাঁদছেন। তার সেই বড় বড় মায়া ভরা চোখে রাজ্যের পানি।তাকে দেখতেই জড়িয়ে ধরে আরেক পর্ব কাঁদতে শুরু করলেন।

মিতা খালা গায়ের একটা আলাদা গন্ধ আছে।সেই গন্ধটা বলে দেয়, উনি বড় কাছের মানুষ।তার স্পর্শ অনেক নিরাপদ।বড় ‘আপন আপন’।

এর কিছুদিন আগেও এ বাড়িটা ‘ঘর’ ছিল।হাসি, কান্না, আনন্দ, গল্প-গুজব, কতকিছু যে জীবনে।

একদিন হঠাৎ করে সব কিছু বরফ শীতল হয়ে গেল।

পৌঁছতেই দ্রুত লিফট ধরলো শরীফ।লিফটের বোতামের ৫ ।

বেল টিপছে শরীফ।বাড়িতে মামা শুধু আছেন।মায়ের সঙ্গে গোটা কয়েকজন।জলদি ফেরা দরকার।দরজা খুলছে না কেন খালা……………..!

কতো কাল ধরে কলিং বেল টিপছে শরীফ, খুলছেই না।যেন একশ বছর পার করার পর দরজা খুললো কেউ।তবুও তো খুলল।অপরিচিত একটি মেয়ে।‘কে মেয়েটি’?

রীতিমতো বিরক্ত শরীফ।মিতা খালার হলো কী বুঝতে পারছে না সে।

মেয়েটা অবাক হতে হতে বললো, ‘আপনি বেল বাজাচ্ছিলেন, কল বেলটা নষ্ট। কার কাছে এসেছেন?’

-মিতা খালা আছেন?

মেয়েটা যেন আরও অবাক হল।এরপর বলল- আপনি মনে হয়, ভুল করে নীচে এসেছেন, ওপর তলার ভদ্র মহিলা মিতা আন্টি। উনি আজ ভোরে মারা গেছেন।

শরীফ বা দিকের দেওয়ালে তাকিয়ে দেখলো নম্বর ‘৪’ লেখা।

‘উনি তো আজ ভোরে মারা গেছেন’– কথাটা যেন কানেই গেলো না তার।

সিঁড়ি দিয়েই উপরে রওয়ানা দিল সে।উপরে উঠে দেখলো স্কুলের এক গাদা ছেলে-মেয়ে।সব বের হচ্ছে।কেউ একজন বলে উঠলো, ‘লাশ নীচে রাখা হয়েছে।বরফ জলদি আনাও।’

কত কথা কানে এসে পৌঁছানোর আগে পিছে চলে যাচ্ছে।শরীফের দম বন্ধ হয়ে আসছে।তার এ বাড়ি থেকে দ্রুত বের হওয়া দরকার।দ্রুত।আরও কিছুক্ষণ থাকলে সে হয়তো মরে যাবে।

 

 

 

 

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

গুজবে কান দিয়ে রংপুরের যে যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেই শহিদুন্নবী জুয়েল আদতে ধর্মভিরু... আরও পড়ুন

আদতে ধর্মভিরু মুসলিম।

নভেম্বরের শুরুতেই নয়া প্রেসিডেন্ট পেতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডাকযোগে আগাম ভোট শুরু হয়েছে চলতি মাসে। এরই... আরও পড়ুন

ডাকযোগে আগাম ভোট

হাজী সেলিমপুত্র ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বহিস্কৃত কাউন্সিলর ইরফান সেলিম এবং তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ... আরও পড়ুন

মোহাম্মদ জাহিদের তিন

টানা দশ ঘণ্টা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে বসে আলোচনার পর আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির... আরও পড়ুন

যুদ্ধবিরতির বিষয়ে

হঠাৎ করে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক মাধ্যমগুলোতে উদ্বিগ্ন আমজনতা। চলছে আন্দোলনও। দাবি উঠছে সর্বোচ্চ শাস্তি... আরও পড়ুন

ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায়

প্রায় চার মাস বাদে পদ্মা সেতুর ৩২তম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান... আরও পড়ুন

উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কাস পার্টির ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একটি নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন করেছে... আরও পড়ুন

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পাঠানো একটি বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ধ্বংস করেছে সৌদি এয়ার... আরও পড়ুন

বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ধ্বংস

করোনা আক্রান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে দেশটির ঐতিহ্য অনুযায়ী নির্বাচনী বিতর্ক... আরও পড়ুন

নির্বাচনী বিতর্ক

পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে চার শিশুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের... আরও পড়ুন

ধর্ষণের অভিযোগে চার শিশু

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।