নুসরাত হত্যাকান্ডের এক বছরে, ছোট ভাইয়ের চিঠি

রিডার::ফেইসবুক

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২০ ০১:০৮:৫৫ অপরাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  
করলে হয়তো কখনও

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।আর দশটা সাধারণ ঘরের মেয়ে। তাকে পুড়িয়ে হত্যা না করলে হয়তো কখনও কোন জায়গায় তার নামটিও উঠে আসতো না। আজ মেয়েটিকে হত্যাকান্ডের এক বছর পূর্ণ হল। ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান ফেইসবুকে বোনকে নিয়ে এক আবেগঘন স্টেটাস দিয়েছে।

রায়হান বলেছে–একটি বছর অশ্রুগঙ্গা বহে নিরবধি উপলব্ধি করছি আমার একমাত্র বোন- নুসরাত আপুকে হারানোর যন্ত্রণা।

আজ আমার শহীদা আপুর মৃত্যুবার্ষিকী ৷

দেখতে দেখতে একটি বছর পার হয়ে গেল।

যদিও এই তিনশ পয়ষট্টি দিন আমাদের কাছে ছিল তিনশ পয়ষট্টিটি রক্তগঙ্গা পাড়ি দেয়ার সমান। প্রতিদিন অবিরত অশ্রুর ধারা বহে গেছে নিরবধি। জানিনা আর কতদিন এই উপলব্ধি আমাদের তাড়িয়ে বেড়াবে।

গত বছর ১০ এপ্রিল- এই দিনে আমার আপু হায়েনাসদৃশ কিছু নরপশুর রক্তলোলুপতার শিকার হয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছে।সবাই জানেন, এর আগে জেলে থাকা সাবেক অধ্যক্ষ সিরাজের নির্দেশে ৬ এপ্রিল নিজের মাদ্রাসায় আমার আপুর গায়ে কেরোসিন ঢেলে নির্মমভাবে পুড়িয়ে দেয় খুনিরা। কিন্তু আমার বোন মাথা নত করেনি। আমার আপু হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহি এক প্রতীক।

রায়হান আরও বলেছে,  হায়েনাদের নিক্ষিপ্ত অগ্নিবাণের দুঃসহ যন্ত্রনায় জর্জরিত হয়েছে আপনার সারা দেহ। আপনার অসহ্য শারীরিক ও মানুষিক যন্ত্রনার অবসান করেছিল মৃত্যু এসে।

‘কিন্তু আপনার এ মৃত্যু লাখো-কোটি মানুষের বিবেককে দিয়েছে প্রচন্ড ঝাঁকুনি। এ মৃত্যু বিবেকবান সকল মানুষকে করেছে হায়েনাদের প্রতি ক্রোধান্বিত, ক্ষুব্ধ।পাশাপাশি তাদের অন্তর কে করেছে বেদনায় ভারাক্রান্ত। আপনার এ মৃত্যু কাঁদিয়েছে সারাদেশকে ‘

‘আপনার এ বিদায় সারাদেশসহ পৃথিবীর মানুষকে করেছে তীব্র শোকাকুল। অনেকেই জানিয়েছে মাতৃবিয়োগের মত শোকের বেদনায় নিমজ্জিত ছিলেন তারা।তাদের অন্তর কে করেছে শূন্যতার হাহাকারে পরিপূর্ণ। আপনি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছেন আমাদের সাহসের আরেক নাম। বাংলাদেশের নিপীরিত হাজারো অভাগীর কাছে হয়ে উঠেছেন বলিষ্ঠ প্রেরণা।’

‘আপনার হত্যাকারকদের উদ্দেশ্যে দেশবাসী দিয়েছে অভিশস্পাত, আর করেছে তাদের মনের ঘৃনার উদগীরণ। জীবনের পড়ন্ত বেলায় রোগ পীড়িত শরিরেও অনেকেই এসেছে আপনার জন্মভূমিতে, আপনার অন্তিম শয়ানের স্থান সোনাগাজীর উত্তর চরচান্দিয়ায়।

‘আপনি প্রতিদিন যে পথে যেতেন আপনার বিদ্যাপীঠে, যে পথে ছিল আপনার চলাচল, বাড়ির আঙিনায় যেখানে নিত্য পড়ত আপনার পদচিহ্ন। সবাই হেঁটেছে সেসব পথে। যেন তারা খুঁজছে তাদের প্রিয় স্বজনকে। পেতে চেয়েছিলো তারা আপনার স্মৃতির স্পর্শ।’

‘আপনি এক আত্মবিশ্বাসী, সাহসী প্রতীবাদী নারী। এ কথা প্রধানমন্ত্রীসহ আখ্যায়িত করেছে সকলেই।আপনি এ যুগের সুলতানা রাজিয়া, আপনি একালের বেগম রোকেয়া। আপনার সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ কত কথা যে বলেছে আপনার সাথে। বেদনার নীল রঙে আর প্রচন্ড আবেগে আক্রান্ত হয়ে, এক বুক শূন্যতার হাহাকার নিয়ে উত্তর চরচান্দিয়া ছেড়ে লাখো মানুষ ফিরে গিয়েছে তাদের নিজ আবাসে। কিন্তু তারা আপনাকে একটুও ভুলেনি।

‘আপনি মানুষের মনে আছেন চির জাগরূক হয়ে। এ দেশের প্রতিবাদী নারীদের তালিকায় লেখা রবে আপনার নাম।’

‘আমার হাতটা কাঁপছে, আর লিখতে পারছিনা। আপনার অজস্র স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছি আমি। মাথার ভিতর তোলপাড় করছে ঘটনা প্রবাহ। ভেবে পাচ্ছিনা কি লিখবো । বোধহয় এই লেখাটিতে আপনাকে কোন সম্ভাষণ জানাতে পারলাম না। কারণ, আপনাকে কোন সম্ভাষণে সম্ভাষিত করবো আমি বুঝতে পারছিনা। যাই করি না কেন তা আপনার জন্য অতি নগন্য হয়ে যাবে আপুনি।’

‘আপনি বীরাঙ্গনার মতো জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন। আপনার এই আত্মদান, এই লড়াইকে দেশবাসী ব্যর্থ হতে দেয়নি। আপনার খুনীরা সর্বোচ্চ শাস্তির অপেক্ষায়।’

 

 

প্রধানমন্ত্রী, প্রশাসন, আদালত, পিবিআই, গোয়েন্দা পুলিশ, সাংবাদিক এবং দলমত নির্বিশেষে সারাদেশ এই অপরাধের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদে উচ্চকিত হয়েছে। জানিনা আল্লাহর দরবারে সিজদায় পড়ে কতটুকু অশ্রু ঝরালে এবং কোন ভাষায় শোকরগোজার করলে এর যথাযথ শুকরিয়া আদায় হবে!

আপুনি আপনার হত্যাকারীদের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।

আপনাকে পুড়িয়ে হত্যার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন।আপনাকে বাচাতে তিনি সর্বচ্ছ চেষ্টা করেছেন, কিন্তু দুর্ভাগ্য, আপনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তবে আপনার শেষ ইচ্ছার বাস্তবায়ন-খুনিদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করবেন বিচারালয়।

নিম্ন আদালতের ফাঁসির রায় উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে এ ব্যাপরে তিনি শতভাগ আশাবাদী।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত চোখের জল নামিয়ে আপনার হত্যার বিচারের দাবিতে লাখো কন্ঠের আওয়াজ বৃথা যাইনি।

আপুনি, আপনি অমর হয়ে থাকবেন চিরদিন। মাদ্রাসার সামনে আপনার প্রতিকৃতি গড়ে তাতে জনগণ আজীবন শ্রদ্ধা নিবেদন করবে। মানব ইতিহাসে সংযোজিত হবে আরেকটি যুগান্তকারী অধ্যায়।

দেশ কাঁপানো প্রতিবাদি কন্যা হিসেবে আপনি আজ আখ্যায়িত। সমগ্র জাতিকে জাগিয়ে তুলে আজ আপনি চিরনিদ্রায় শায়িত।আপনার মত হাজারো নুসরাতের সম্ভ্রম রক্ষা করতে আমরাও আজ প্রতিবাদী।

আপু, গত বছরের এই দিনে কখন যে আপনি।দু চোঁখ বন্ধ করেছিলেন বুঝতেই পারিনি । আপনাকে আজ মনে পড়ে- এ কথা বলবো না ! বরং প্রতিদিন প্রতিক্ষনে আপনাকে মনে পড়ে । আপনার অভাব আমি সব সময় অনুভব করি। আপনাকে নিয়ে কিছু লিখতে বসলে, চোঁখে অশ্রু ধরে রাখতে পারি না। আজ ও তার ব্যতিক্রম হয় নি।

একটি বছর কেটে গেল চোখের জল ও হ্নদয়ের অবিশ্রান্ত রক্তক্ষরণে। আজও দু’চোখে ভাসে আপনার শেষ দিনগুলোর নির্মম কষ্টের দৃশ্যটি। কতই বর্বর ও নিষ্ঠুর ছিল!

সেই দিনই সব স্বপ্ন কাচেঁর মত ভেঙ্গে চুরমার হয়েগেয়েছিল।সেই দিন মনে হয়েছিল, আমি আপনাকে ছেড়ে হয়তো বাচঁবোনা। সেদিন আকাশ ভারি হয়েছিল, মা বাবা ভাইয়ার আহাজারিতে, হাসপাতালের ফ্লোরে পা দিয়ে আঘাত করেছিলাম।

নিজের চুল নিজে ছিড়েছিলাম। কিন্তু আপনি জেগে ওঠেননি, আর সাড়া দেননি।

আমি না খুব নিষ্ঠুর হয়ে বুকে পাথর বেঁধে এখনো আপনাকে ছাড়া বেঁচে আছি। আপনি প্রায়শ বলতেন, মরে গেলে দেখবি আমাকে ছাড়া তোদের কি অবস্থা হয়?

দেখছেন ত এইবার তাহলে ফিরে আসুন আপু। জানি আপনি আর ফিরে আসবেন না। অকারণে তবু কেন আপনাকে কাছে ডাকি! আপনাকে আবার ও ফিরে পাওয়ার সব যুক্তির কাছে যখন আমি হেরে যাই, তখন একটা আর্তনাদ ও আশ্রু ছাড়া আর কিছুই থাকেনা।

আপনি নেই আমাদের মাঝে অনুভব করতেই দমবন্ধ হয়ে আসে। আপনার মায়াভরা স্পর্শের ভালোবাসাটুকু পেতে দিবারাত্রিতে আমার বুকের গহীন উপকূল কেমন যেন পুড়ে পুড়ে যায়।

মৃত্যুর যন্ত্রনা কত কঠিন, তা আপনাকে দেখেই বুঝেছি। আপনাকে হারানোর শোকটা কতটা কষ্টের তা পৃথিবীর কাউকে বোঝাতে পারবোনা। যোগত্যার বিচারে ফ্যামিলির সবার চেয়ে আপনি। মেধাবী ও অনন্য।এভাবেই আপনি চিরবিদায় নিবেন তা একেবারেই কল্পনাতীত।

এখনো ঘুমের ঘরে জেগে উঠি আপনার শেষ দিনগুলির নির্মম কষ্টের কথা স্বপ্নে দেখে। স্বপ্নেই জেগে থাকবেন আপনি আমার মাঝে আজীবন, আপনার স্মৃতিভার আমি বয়ে যাব সারা জীবন। শেষ রাতে চোখে একফোঁটা ঘুম আসেনা আপনার কথা ভেবে।

এখন আমি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি । নিজের স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার অনেক অমিল তা এখন বুঝতে পারছি। চারদিকে অজস্র মিথ্যার ভিড়ে একটা সত্যের পিছনে ছুটছি নিরন্তর।

পৃথিবীতে এত মানুষ কিন্তু একজন মানুষই মিলেনা, যে কিনা আমাকে একটু অকৃত্রিম ভালবাসা উপহার দেবে!আপু, ঠিক তক্ষুনি আপনার কথা মনে পড়ে আমার।

আপনার সাথে পথ চলার সময়গুলকে খুব অনুভব করছি। জীবন চলার পথে আপনার স্নেহের পরশেই বড় হয়েছি। এ ঋণ আমি মেটাবো কিভাবে!

আপনি বিহীন প্রতিটি দিন ও মুহূর্ত ছিল বিষাদময়, প্রতিটি একাকিত্ব সময় ছিল হাহাকার ও অশ্রুসিক্তে ভরা। প্রতিটি রাত ছিল র্নিঘুম ও আপনাকে কাছে না পাওয়ার অতৃপ্ত যন্তণার! আপনার ভালোবাসা, আপনার স্নেহ, আপনার আদর আজও আমার স্মৃতিতে সতেজ হয়ে ভাসে।

আপনার হত্যাকারিদের ফাঁসির আদেশ হাইকোর্টে বহাল থেকে দ্রুত যেমন কার্যকর হওয়া চাই তেমনি আপনার মত লাখো নুসরাতের নিরাপদ ও সুস্থ জীবন কামনা করি।

একজন প্রতিবাদীর মৃত্যুতে যেন বিশ্ব লিখে, ‘আমাদের চোখের জল ঝরিয়ে, নুসরাত তুমি কিভাবে চলে গেলে মাটির নিকষ অন্ধকারে?

স্রষ্টার সকল সৃষ্টি ভালো থাকুক… করোনার মহামারী থেকে আল্লাহ বাংলাদেশের মানুষ কে নিরাপদে রাখুক।

আর আজকে আমার আপুর এই বিদায়ের দিনে-বেদনার দিনে দেশবাসী সকলের নিকট আমার আপুর জন্যে আন্তরিক দোয়া কামনা করছি ৷ মহান আল্লাহ্ যেন আমার আপুর সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে, তাঁর কবরের জীবন ও পরকালের জীবন শান্তিময় করেন৷

আমীন…।

রায়হান

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

সরকার দেশে লক ডাউন ঘোষণা না করে সাধারণ ছুটি দিয়ে বড় রকমের ভুল করেছে বলে... আরও পড়ুন

রাজধানী গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় অন্তত পাঁচজন কভিড-১৯ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আজ বুধবার রাতে... আরও পড়ুন

হাসপাতালটির নিচের

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করায় বাংলাদেশের সঙ্গীতশিল্পী মাঈনুল আহসান নোবেলের বিরুদ্ধে মামলা... আরও পড়ুন

বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছেন

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ কমাতে ঘরে থাকার মেয়াদ আর বাড়ছে না। তবে আগামী ৩১ মে থেকে... আরও পড়ুন

পর্যন্ত স্বাস্থ্য মেনে সীমিত

কথায় আছে, প্রেমের মরা জলে ডুবে না। একবার ফের সেই সত্য প্রমাণ করলেন যুক্তরাজ্যের চিকিৎসক... আরও পড়ুন

জলে ডুবে

গত এক দিনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। শন্যাক্ত হয়েছে আরও এক হাজার... আরও পড়ুন

এক হাজার ৫৪১জন। এ

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে  রুখে দাঁড়ানোর এখনই সময়। যুদ্ধে হতাহত মার্কিন সেনাদের স্মরণ করার... আরও পড়ুন

ইরানের পররাষ্ট্র

দেশের সব ধরণের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সব ধরণের রোগীকে পৃথক... আরও পড়ুন

পৃথক ইউনিটে চিকিৎসা

একবার ফের যুক্তরাষ্ট্র মনে করিয়ে দিলো গণতন্ত্র দেশটিতে এখনও মিলিয়ে যায়নি। প্রথমবারের মতো দেশটির প্রেসিডেন্ট... আরও পড়ুন

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে

  ভারতীয় সীমান্তে উত্তেজনায় সর্বোচ্চ খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট... আরও পড়ুন

প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।