স্পার্টাকাস::দুর্ভাগা এক গ্ল্যাডিয়েটর

রিডার::রোমান ইতিহাস ::শ্রুতি আনাম

বুধবার, ২ মে, ২০১৮ ০২:১৩:৪৫ পূর্বাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  
খেতাব ভূষিত স্পার্টাকাস ছিলেন একজন রোমান ক্রীতদাস। যদি প্রথম জীবনে যোদ্ধা হিসাবেই তার শুরুটা ছিল।তিনি

হলিউডের সিনেমায় ‘বীর’ খেতাব ভূষিত স্পার্টাকাস ছিলেন একজন রোমান ক্রীতদাস। যদি প্রথম জীবনে যোদ্ধা হিসাবেই তার শুরুটা ছিল।তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার।তাঁর বিদ্রোহকে রোমানদের ইতিহাসবেত্তাদের একটি অংশ বীরত্বের প্রতীক হিসাবেও দেখলে, ইতিহাসের পাতায় উল্টো পাশটিও আছে।

ইতিহাস বলছে, স্পার্টাকাসের জন্ম রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত থ্রেস অঞ্চলের এক গ্রামে, আজকের মানচিত্রে যার অবস্থান বলকান অঞ্চলে। ধারণা করা হয়, তরুণ স্পার্টাকাস তার শক্তিশালী গড়নের কারণে রোমান সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে অজ্ঞাত কোন কারণে তাকে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়েছিল।আর তাঁর জীবনের খারাপ দিনগুলি তখন থেকেই শুরু।

অনেকের মতে,  চাকরিচ্যুত স্পার্টাকাসের ভাগ্য কোন কারণে দাস বিক্রির হাটে যেয়ে আটকে গিয়েছিল। এক দিনমজুর ঠিকাদারের কাছে বিকিয়ে দেওয়া হয় তাকে। বেশ কয়েক বছর সেখানে থেকেও ছিলেন।

রোমে শক্তিশালী ক্রীতদাসদের বাছাই করে বিভিন্ন যুদ্ধকৌশলে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে ‘গ্ল্যাডিয়েটর’ নামের যোদ্ধায় পরিণত করা হতো। এই গ্ল্যাডিয়েটরদের রোমের বিভিন্ন স্থানে মল্লযুদ্ধে ব্যবহার করা হতো।

সেই নৃশংস ক্রীড়ায় গ্ল্যাডিয়েটররা বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষায় অন্য গ্ল্যাডিয়েটরদের হত্যা করতো। খেলার শেষে একমাত্র জীবিত গ্ল্যাডিয়েটরকে বিজয়ী ঘোষণা করা হতো।পুরস্কার হিসাবে হয়তো মিলতো সেইদিনের আহারে এক টুকনো মাংসের স্টু।

রোমানদের কাছে এই পাশবিকতা চুড়ান্ত বিনোদন ছিল বটে। ভাগ্যক্রমে স্পার্টাকাসও একজন গ্ল্যাডিয়েটর দালালের নজরে পড়েন। এদের রোমানরা ‘ভাটিয়া‘ নামে ডাকতো। সেই ভাটিয়া স্পার্টাকাসকে কিনে ন্যাপলসের বিখ্যাত নেউস লেন্টুলুস গ্ল্যাডিয়েটর স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে স্পার্টাকাস বনে গেলেন এক গ্ল্যাডিয়েটর যোদ্ধা। ক্রীতদাসের শেকল থেকে মুক্ত স্পার্টাকাস জড়িয়ে পড়লেন রোমান পাশবিকতার ফাঁদে।

গ্ল্যাডিয়েটর স্কুলের চার দেয়ালে বন্দি স্পার্টাকাস খুব দ্রুত হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি বহু সৈনিককে হত্যা করেছেন, কিন্তু এই পাশবিক হত্যাযুদ্ধ তার কাছে সম্পূর্ণ অনৈতিক লাগতো।একটু মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে চেয়েছিলেন তিনি।

তার ভেতরে অসন্তোষ এবং বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে লাগলো। রোমানদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কোনো লাভ হবে না, এ কথা তিনি বেশ ভালো করেই জানতেন।

 

 

খোদ সম্রাটরা শত চেষ্টা করেও রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জয় পায়নি। সেতো নেহাত গ্লাডিয়েটর দাস। তবে স্পার্টাকাস আশা নিয়ে বুক বাঁধলেন। তিনি অন্যান্য সহযোদ্ধাদের তার আক্রোশের ব্যাপারে অবহিত করলেন।

প্রাথমিকভাবে কেউ সাড়া না দিলেও একদিন এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে যোদ্ধাদের সাথে প্রশিক্ষকদের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ঘটনা হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। স্পার্টাকাস এই সুযোগে প্রায় ৭৮ জন গ্ল্যাডিয়েটরকে একতাবদ্ধ করে পরিকল্পিতভাবে প্রশিক্ষকদের উপর হামলা করে বসেন। স্কুলের বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংস করে দিয়ে স্পার্টাকাস তার দলবল নিয়ে ভিসুভিয়াস পর্বতের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যান।

বিখ্যাত দার্শনিক প্লুটার্কের বলেছেন, ৭৩ খ্রিষ্টপূর্ব আমলে স্পার্টাকাস বাহিনীর কাছে তেমন অস্ত্র তো ছিল না।অগ্যতা স্পার্টাকাসের বিদ্রোহী গ্ল্যাডিয়েটররা অস্ত্র হিসেবে রান্নাঘরে ব্যবহৃত বিভিন্ন লোহার সরঞ্জামকে বেছে নিয়েছিলো।  কিন্তু পালিয়ে যাবার সময় তারা গ্ল্যাডিয়েটরদের অস্ত্র বোঝাই একটি গাড়ি পেয়ে যায়। সেটি লুট করতে দ্বিতীয় ভাবেনি স্পাটাকাস।

 

 

এতে করে সেই বিদ্রোহীদের নিয়ে ছোটখাট সেনাবাহিনী গড়ে ফেলেন তিনি। স্পার্টাকাস নিজে একজন রোমান সেনা ছিলেন। তাই সেনাবাহিনীর আক্রমণের ধরন সম্পর্কে তিনি ভালই ধারণা রাখতেন।

স্পার্টাকাসের তত্ত্বাবধানে ভিসুভিয়াসের পাদদেশে ক্রীতদাসদের সামরিক প্রশিক্ষণ চলতে থাকে। ততদিনে সমগ্র রোমে স্পার্টাকাসের বিদ্রোহের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থান থেকে দলে দলে ক্রীতদাস এবং গ্ল্যাডিয়েটররা গোপনে পালিয়ে এসে সেই দলে যোগ দিতে থাকে। দল ভারী হওয়ার পর স্পার্টাকাস তিনজন গ্ল্যাডিয়েটরকে নেতা হিসেবে নিযুক্ত করলেন।কী কান্ড!

স্পার্টাকাসের সাথে তাঁর স্ত্রীও পালিয়ে এসেছিল। সেই অর্থে গ্লাডিয়েটরের স্কুল থেকে নিজেকে মুক্ত করার পরিকল্পনা তার আগের থেকেই ছিল। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁর স্ত্রীর নাম সম্পর্কে কোনো তথ্য মেলেনি।

স্পার্টাকাসের পরিহিত লোহার টুপি

ইতিহাসবিদরা ধারণা করেন, স্পার্টাকাসের স্ত্রীও একজন থ্রেসীয় ক্রীতদাসী ছিলো। প্রাচীন পুরোহিতদের ন্যায় সে বিভিন্ন লক্ষণ বিচার করে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতেন।

প্লুটার্ক তার পাণ্ডুলিপিতে উল্লেখ করেন, ‘স্পার্টাকাসের স্ত্রী দেবী ডিওনিসাসের পূজা করতো। এর ফলে তার মাঝে কিছু ঐশ্বরিক ক্ষমতার লক্ষণ দেখা দেয় বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। একদিন স্পার্টাকাস ঘুম থেকে জেগে আবিষ্কার করেন, তার গলায় একটি সাপ পেঁচিয়ে রয়েছে। এই দৃশ্য দেখে তার স্ত্রী ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, এই সাপ স্পার্টাকাসের ধ্বংসের প্রতীক। এই বিদ্রোহে তার করুণ পরিণতি হবে।’

বেশ কিছু সময় পার হলে, স্পার্টাকাস এবং দাস বিদ্রোহীদের পলায়নের খবর রোমান সিনেটের কাছে পৌঁছে গেলো। তবে তারা স্পার্টাকাসবাহিনীকে শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবতে নারাজ ছিলেন।কোথায় রোমান, সভ্যতা কোথায় দাসদের বাহিনী!

বিষয়টি অনেকটা এমন।

গুরুগম্ভীর রোমান সিনেটের কাছে তারা হাসির পাত্রই ছিল।নিতান্ত তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের বিষয় যেন।

ওদিকে স্পার্টাকাসের বাহিনী ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী সমতুল্য হয়ে উঠলো। একই সময়ে রোমের বিখ্যাত সেনারা দুটি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলো। তাই রোমে অবস্থানরত সেনাসদস্যের সংখ্যা নিতান্ত কম ছিল।

 

 

তবে সিনেটের বিশ্বাস ছিল রোমের সাধারণ যোদ্ধারাই পারবে স্পার্টাকাসকে বধ করতে। তারা গাইয়াস ক্লডিয়াস গ্লেবার নামক এক সেনাধ্যক্ষের অধীনে প্রায় তিন হাজার বৃদ্ধ এবং অপ্রশিক্ষিত সৈনিকের একটি দল প্রেরণ করে।

প্রাথমিক আক্রমণের ধাক্কায় নব্য প্রশিক্ষিত গ্ল্যাডিয়েটর এবং দাস বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। খণ্ড খণ্ড আক্রমণে বার বার পরাস্ত হতে থাকে দাসরা। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্লেবার দাসদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে কোণঠাসা করতে থাকেন। দিন শেষে যুদ্ধ বিরতি পেলে স্পার্টাকাস যুদ্ধ নীতি ভেঙ্গেই রাতের অন্ধকারে গোপনে আক্রমণ করে বসেন ঘুমন্ত সৈনিকদের ব্যারাকে।

অতর্কিত হামলায় রোমান সেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ওদিকে দাসরা ভিসুভিয়াসের বিভিন্ন গোপন স্থান থেকে অগ্নি তীর নিক্ষেপ করে রোমানদের ঘাঁটিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। গ্লেবার কিছু সৈনিকসহ প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যায়। স্পার্টাকাস এবং তার বাহিনী রোমানদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র লুট করে নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে নেয়।

গ্লেবার রোমে ফিরে গিয়ে অন্যান্য সিনেটরদের স্পার্টাকাসের শক্তিবলের কথা জানান। কিন্তু সিনেটররা তার কথা বিশ্বাসই করতে চাইছিলেন না। সিনেটে অনেকেই তার বিরুদ্ধে কথা বলে তাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আখ্যা দেয়। রোম স্পার্টাকাস দমনের উদ্দেশ্যে এবার পাঠালেন সেনাধ্যক্ষ পাবলিয়াস ভ্যারিনিয়াসকে।

 

 

ভ্যারিনিয়াস দলকে দু’ভাগে ভাগ করলেন। স্পার্টাকাস পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিলেন তার দলবল নিয়ে। ভ্যারিনিয়াস বাহিনী দাসদের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হলেন।

স্পার্টাকাস ছেলেখেলার মতো ভ্যারিনিয়াসকে এক ধাক্কায় ঘোড়া থেকে ফেলে অপমান করেন। তারপর স্পার্টাকাস বেশ কয়েকটি রোমান অধ্যুষিত অঞ্চল (নোরা, নুসেরিয়া, থুরি এবং মেটাপন্টিয়াম) আক্রমণ করে সিনেটরদের বাসস্থান ধ্বংস করে দেন।

এসময়ে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাস এবং রাখালরা স্পার্টাকাসের বাহিনীতে যোগ দেয়। এই জয়ের মাধ্যমে স্পার্টাকাসের বাহিনীতে অশ্বারোহী বাহিনীর সংযোজন হয়। ৭২ খ্রিস্টপূর্বের শেষে স্পার্টাকাসের বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় চল্লিশ হাজারের কোঠায় গিয়ে ঠেকলো।

পুরোদস্তুর সেনাবাহিনী।

 

হলিউডে নির্মিত স্পার্টাকাস সিনেমার সেনাবাহিনীর দৃশ্য

রোমানদের অহংবোধে কেউ যেন সজোরে চড় মেরে বসলো । যা ক্রমান্বয়ে গুপ্ত আতঙ্কে পরিণত হচ্ছিল। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো একদিন পুরো রোম স্পার্টাকাসের কব্জায় চলে আসবে!

কিন্তু রোমান সিনেট এই পরিণতি রুখে দিতে সোচ্চার হলো।  এবার সিনেটররা বেশ শক্তিশালী বাহিনী গঠন করলেন। সেনাবাহিনীর সেরা যোদ্ধাদের সমন্বয়ে তৈরি হলো প্রায় কুড়ি হাজার সদস্যের এই বাহিনী। এবারও এই বাহিনী দু’ভাগ করে রোমান কন্সাল লুসিয়াস গেলিয়াস পাবলিকোলা এবং নেয়াস কর্নেলিয়াস ক্লডিয়ানাসের অধীনে ভিসুভিয়াসের উদ্দেশ্যে পাঠানো হলো।

তখন স্পার্টাকাস তার সহ-অধিনায়ক ক্রিক্সাসের সাথে পুরো বাহিনী নিয়ে আল্পস পর্বতমালা অভিমুখে সফররত ছিলেন। পথিমধ্যে তারা গেলিয়াস বাহিনীর সাথে মুখোমুখি হয়। কন্সাল গেলিয়াসের সুসজ্জিত বাহিনী দুদিক থেকে স্পার্টাকাসদের ঘিরে ধরে। যুদ্ধে ক্রিক্সাস মারা পড়েন। এতে বেশ ঘাবড়ে যান স্পার্টাকাস।

দক্ষিণ দিক থেকে গেলিয়াস বাহিনী স্পার্টাকাসদের পিছু হটাতে থাকে।  পেছনে যাওয়ারও সুযোগ নেই। কারণ, উল্টো দিক থেকে ঘিরে রেখেছে লুসিয়াস। স্পার্টাকাস শেষ সম্বল হিসেবে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। তার নির্দেশে দাসদের অশ্বারোহী বাহিনী পুরোদমে আক্রমণ শুরু করে। ইতিহাসের পাতায় থ্রেসীয়রা অশ্বারোহী হিসেবে সুপরিচিত। তাই তাদের অশ্বারোহীদের সামনে মুখ থুবড়ে পড়লো রোমান প্রতিরোধ।

 

ভিসুভিয়াস পর্বতের পাদদেশে স্পার্টাকাস বাহিনীর নির্দশন আজও দেখা যায়

অশ্বারোহীদের পেছনে নতুন উদ্যমে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো পদাতিক বাহিনী।

প্লুটার্কের পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী, ‘স্পার্টাকাস হঠাৎ করে অশ্বারোহীদের আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে রোমান বাহিনী পরাস্ত হলেন । আর বিজেতা স্পার্টাকাস রোমানদের রসদ লুট করে নিয়েছিল। কী লুটেরা!

গেলিয়াস যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটলো। বিজয়ী দল নিয়ে স্পার্টাকাস আল্পসের দিকে যাত্রা শুরু করেন।

একের পর এক রোমান সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দাসদের আত্মবিশ্বাস প্রবল হয়ে উঠলো। তাদের সামনে আর কোনো বাধা রইলো না। স্পার্টাকাসের পরিকল্পনা ছিল আল্পস পর্বতমালা অতিক্রম করে গাউল প্রদেশে প্রত্যাবর্তন করা। গাউল প্রদেশ রোমান সাম্রাজ্যের বহির্ভূত হওয়ায় দাসরা সেখানে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারবে।

 

কিন্তু এই সহজ পরিকল্পনা কেন যেন স্পার্টাকাস বাহিনীর মনঃপুত হলো না। এক অজানা কারণে পুরো বাহিনী নিজেদের গতিপথ পরিবর্তন করে পুনরায় রোমে ফেরত আসলো। আর সেই সিদ্ধান্তই স্পার্টাকাসের জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ালো।

আজ অবদি এই ঘটনার পেছনে মূল কারণ অজ্ঞাত রয়েছে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেরি স্ট্রাউসের বলেছেন, ‘স্পার্টাকাসের রোম পুনঃপ্রত্যাবর্তন নিয়ে অনেকগুলো তত্ত্ব প্রদান করে হয়েছে। কিন্তু এর মাঝে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হলো, স্পার্টাকাসের সহযোদ্ধারা গাউল যেতে রাজি ছিল না।’

অনেকেই ধারণা করেন, দাসদের প্রবল আত্মবিশ্বাসের কারণে তারা পালিয়ে যেতে চায়নি। এমনকি রোমে ফিরে আসার সময় তারা বিভিন্ন রোমান প্রদেশে আক্রমণ করে এবং বিজয়ী হয়। স্পার্টাকাস এবার নতুন পরিকল্পনা করলেন।

তিনি পুরো বাহিনী নিয়ে মেসিনা প্রণালী অঞ্চলে অবস্থান করলেন। সেখান থেকে জলপথ পাড়ি দিয়ে সবুজ সিসিলিতে দাসদের স্বপ্নভূমি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে থাকেন তিনি। কিন্তু স্পার্টাকাসের এজন্য প্রয়োজন বেশ কিছু জাহাজ। জাহাজ পরিচালনার সুদক্ষ নাবিকেরও প্রয়োজন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে এতকিছু যোগাড় করা এককথায় দুঃসাধ্য ছিল।

স্পার্টাকাস এবার ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করলেন। তিনি সিসিলির জলদস্যুদের সাথে যোগাযোগ করলেন। লুট করা বিভিন্ন মূল্যবান অলংকার এবং মোহরের বিনিময়ে বেশ কিছু জাহাজ এবং নাবিক ক্রয় করলেন।

জলদস্যুরা অল্প সময়ের মধ্যে স্পার্টাকাসকে জাহাজ এবং নাবিক প্রস্তুত করে দিবে বলে কথা দেয়। কিন্তু এক অজানা কারণে জলদস্যুরা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। এর ফলে বিপদে পড়ে যায় স্পার্টাকাস। রোমান সাম্রাজ্যের আবদ্ধ ভূমিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ে দাসদের ঐতিহাসিক বাহিনী।

স্পার্টাকাস সিসিলি প্রত্যাবর্তন ব্যর্থ হওয়ার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় পেছন দিক থেকে ধাবমান হাজার হাজার রোমান সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

অন্যদিকে রোমান সেনা নেতৃত্বে আবির্ভাব ঘটলো নতুন নেতা মার্কাস লিসিনিয়াস ক্রেসাসের। স্পার্টাকাসের পরবর্তী প্রতিপক্ষ এই ক্রেসাস রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম নিষ্ঠুর সেনাপ্রধান হিসেবে পরিচিত। তিনি স্পার্টাকাসকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। এর পূর্বে স্পার্টাকাস তার অধীনস্ত দুই লিজিয়নকে পরাজিত করেছিলেন। সরাসরি নেতৃত্ব না দিলেও ক্রেসাস সেই পরাজয়ে অপমানিত বোধ করেছিলেন।

তাই তিনি প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য উন্মুখ ছিলেন। শাস্তি হিসেবে নিজের পরাজিত দুই সেনাধ্যক্ষকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান ছাড়াও লিজিয়নের প্রতি দশজনের একজনকে জনসম্মুখে হত্যা করেছিলেন তিনি।

স্পার্টাকাস যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি জানতেন, ক্রেসাস তার সবচেয়ে সেরা বাহিনী নিয়ে তাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তাই তিনি প্রথমেই ক্রেসাসকে শান্তি চুক্তির আহ্বান করেন। কিন্তু ক্রেসাস জানতেন, তিনি দাসদের থেকে শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে এসেছেন। তাই তিনি এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।

 

 

উল্টো স্পার্টাকাস বাহিনীর সীমান্তের চারদিকে দেয়াল নির্মাণের নির্দেশ দেন। স্পার্টাকাস তাৎক্ষণিকভাবে সুড়ঙ্গের সাহায্যে পালিয়ে যাওয়া চেষ্টা করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে হাজার হাজার দাস সৈনিক পেছনে পড়ে যায়। এর ফলে স্পার্টাকাসের বাহিনী শক্তিতে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।

স্পার্টাকাসের পক্ষে পালিয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু ছিল না। কিন্তু তিনি আর পালাতে রাজি হলেন না। যেহেতু তার রোম ত্যাগ করার কোনো পথ খোলা নেই, তাই তিনি ক্রেসাসের মুখোমুখি হবার সিদ্ধান্ত নিলেন।

ক্যালেণ্ডারের হিসেবে সময় তখন ৭১ খ্রিস্টপূর্ব। প্রায় ত্রিশ হাজার সৈনিক নিয়ে তিনি ক্রেসাসকে আক্রমণ করে বসেন।  স্পার্টাকাস দুই ধাপে আক্রমণ করার পরিকল্পনা দিলেন। প্রথম ধাপে অশ্বারোহীরা ক্রেসাসের তীরন্দাজদের আক্রমণ করবে।

দ্বিতীয় ধাপে স্পার্টাকাস পদাতিক বাহিনী নিয়ে সরাসরি ক্রেসাসকে হত্যা করার চেষ্টা করবে।

 

শিল্পীর চোখে স্পার্টাকাস শিবির

কিন্তু যে উদ্যমে দাসরা যুদ্ধ শুরু করেছিলো, অচিরেই সেই উদ্যম হারিয়ে আহত সৈনিকদের আর্তনাদে পরিণত হলো।

অশ্বারোহী বাহিনী তীরন্দাজদের সীমানা পর্যন্ত পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো। ওদিকে স্পার্টাকাসের পদাতিক বাহিনী লিজিয়নদের আক্রমণে দিশাহারা হয়ে পড়লো। খুব অল্প সময়ের মধ্যে স্পার্টাকাস বাহিনী পরাজিত হলো। যুদ্ধে স্পার্টাকাস প্রাণ হারালেন।

ঠিক কীভাবে তিনি মারা গেছিলেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা সম্ভব হয়নি।

তবে অধিকাংশের মতে, তাকে শত্রুরা চারপাশ থেকে ঘিরে বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেছিলো। অন্যান্য দাসদের রোমান আইন অনুযায়ী বিভিন্নভাবে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। এর মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম সাহসী সংগ্রামের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটে। ইতিহাসবেত্তারা স্পার্টাকাসের শেষ যুদ্ধকে ‘তৃতীয় সারভিল যুদ্ধ’ কিংবা ‘গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধ’ নামে চিহ্নিত করেছেন।

ইতিহাস ব্যর্থ সেনানায়ককে মনে রাখেনা।সফলতার গুন গাইতেও ছাড়ে না।কিন্তু রোমানদের তো বটেই দাস প্রথা সরিয়ে স্বাধীন মানুষ হিসাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখার নায়কদের সারিতে আজও সে মানুষটি নাম শোনা যায়, তিনি হলেন স্পার্টাকাস!

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

ঐতিহাসিক আল-আকসা মসজিদ খুলে দেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল মসজিদটি। দুই... আরও পড়ুন

মসজিদ খুলে দেওয়া

ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর থেকে সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা ছাড় বাতিল করায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার... আরও পড়ুন

আইনগত পদক্ষেপ

এক করোনা ভাইরাসের মহামারীতে কুপোকাত গোটা বিশ্ব। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে অন্তত ৬০ লাখ মানুষ... আরও পড়ুন

সম্প্রতি চীনের একটি

এবছর এসএসসি ও সমমানের ৮২ দশমিক ৮৭ ভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ... আরও পড়ুন

সকালে গণভবন থেকে

সিকদার গ্রুপের এমডি রন হক সিকদার ও তার ভাই দীপু হক সিকদারের ক্ষেত্রে কোনো ভ্রমণ... আরও পড়ুন

বিদেশে ভ্রমণে নিয়ম

২৫ মে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের বৃহত্তম শহর মিনিয়াপলিসে পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ নির্মমভাবে... আরও পড়ুন

কৃষ্ণাঙ্গ নির্মমভাবে

মুক্তির ৬৭ দিনের মাথায় দলের জেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ এবং ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন বেগম খালেদা... আরও পড়ুন

ফিরোজায় স্বাস্থ্যবিধি

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ হ্রাসে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত লকডাউন বাড়াতে যাচ্ছে ভারত সরকার। সেই সঙ্গে... আরও পড়ুন

শপিংমল খোলারও

করোনা ভাইরাসে প্রকোপ থেকে বাঁচতে টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি শেষে আগামীকাল রবিবার থেকে সীমিত... আরও পড়ুন

অফিস খুললেও সর্বোচ্চ আদালত সহসাই খুলছে

২৪ ঘন্টায় করোনা আক্রান্ত ২৮জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।আজ শনিবার সকাল ৮টা অবদি ৬১০জনের মৃত্যু হয়েছে।... আরও পড়ুন

নতুন শন্যাক্ত হয়েছে ১

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।