এক যাত্রায়

রিডার::নাসের ইউসুফ

বুধবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০৮:১৬:৪৭ অপরাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  
বসে থাকা নারীর কথা

‘কেন’!

‘আমি তো আগে পৌঁছেছি। ইনফ্যাক্ট, আমার প্লেন আসতে ঢের দেড়ি আছে, ব্যাপারটা কী বলুন তো’? আমি দারুণ ধৈর্যের সঙ্গে কাউন্টারে বসে থাকা নারীর কথা শুনে যাচ্ছিলাম।

ভদ্রমহিলার অনুরোধকে উপেক্ষা করা দায়। অসুস্থ আরেক যাত্রীকে আমার টিকিটটা দিতে হল। মাঝে মাঝে অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে হয় আর কী? পরের ফ্লাইট টা ধরতে আরও ৩ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

আমার তাড়া ছিল না। জীবনের একটা সময় শেষে এখন কেন যেন আমার কোন ব্যাপারে তাড়া কাজ করেনা। আমি ধীর স্থির থাকি।টুক টুক করে কাজ করে যাই। টুক টুকু করে চলি ফিরি।আসলে আমি অপেক্ষা করি না কারও।ভাল-মন্দ নিয়ে বেঁচে আছি।

বারোসো ভেলি থেকে একটু দূরের একটা ছোট্ট পাহাড়ি শহরে আমার বাস। আমি কাজ করি। মাঝে মাঝে নিজেকে ‘থ্রোন অব বার্ড’ এর সেই সুন্দরী মেজাইয়ের পুরুষ সংস্করণ মনে হয়। কেন জানি না।

নিজের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথা বলি। আমার ছেলে দুটো এক অক্ষরেও বাংলা উচ্চারণ করতে চায় না। আমার অংশ অথচ তারা আমার মায়ের ভাষাও জানতে চায় না। ‘বেয়াদব বাচ্চা’ বলা যায়। আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরের সন্তান ওরা।

প্রথম স্ত্রীর চেহারা হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে। কেন যেন বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার দরকার পড়লে তখন মনে পড়ে । ঝোঁকের বশে বিয়েটা সেরেছিলাম।হুট করে।এলোমেলো সময় ছিল।

বুঝতে পারছিলাম না কী করা যায়।বিয়ে করে ফেললাম।দুজনের কেউ তৈরী ছিলাম না, না ভালবাসায় না হারিয়ে যাওয়াতে। ২৩ দিনের সংসার।

তেমন হুট করেই ভেঙ্গে গেল। তখন দেশে থাকতেই অসহ্য লাগতো।একটা বিয়ে, পুরো দস্তুর সংসার ভাবা যায় না।………..ছেলেরা প্র্রেমের হারটা কেন যেন সহজভাবে মেনে নিতে জানে না। মেনেই নিতে পারে না হয়তো। আমরা নিজেকে পুরুষ ভাবি যে।

বিক্ষিপ্ত চিন্তায় মায়ের মুখটা মনে হল।মা যে কতো রকমের রান্না করে খাওয়াতো……..আমি খেতে বরাবর ভালবাসতাম। আরে ভাই, এতো কিছু কেন করি, খাওয়া জন্যই তো করি।

আর এখন রান্না করে অ্যান মায়ামি। মাস গেলে পড়ে আমার পকেট ভালই কাটে বেচারি তবে মাঝে মাঝে ইউটিউবের কল্যাণে খানিকটা বাঙ্গালি খাবার জুটেই যায়, ওর হাতে।

আমার এখনকার বউয়ের আবার রান্নায় ঝোঁক নেই। আমার নেই হেসেঁলে ঢোকার আগ্রহ। দুইজনই পাক্কা কর্মী, পকেট ভরে পয়সা কামাই। কফি শপে গেলাম একটু ভ্যানিলা পেস্ট্রি খেতে মন চাইল ।যদিও একটু শাহবাগের কলিজি সিঙ্গারা আর কড়া করে দুধের চা হলে মন্দ হতো না। তাও সেই টুকু আবদার কেই বা গ্রহণ করবে।

চামচে করে তুলতুলে কেকের একটা টুকরো মুখে পুড়বো ঠিক তখনই মনে হল পেছন থেকে কিছু একটা পড়লো, যাহ বাবা। কেকটুকু মুখ তো পুড়তাম। পিছনে ফিরে তাকালাম। টোকিও যাচ্ছি। এই একটা কাজ করি বছর কুড়ি বছল আগে পৃথিবী ঘোড়ার যে কথা দিয়েছিলাম, সেটা চালিয়ে যাচ্ছি।যদিও নিজের জন্য, তারপরও কেন জানি মনে হয়, আমি আমার জায়গায় ঠিক আছি, কথা রেখে চলছি।

নাকে এসে ঠেকলো ওলের সুগন্ধি।পরিচিত গন্ধ।

মনে হল বাঙ্গালি কোন মেয়ে হবে।মন আর চাইলো না ফিরে তাকাই। আমার বাঙ্গালি মেয়েতে বড় অরুচি।যদিও আমি নিজেই বাঙ্গালি।

আর চোখে দেখলাম বই পড়েছে। তুলে দেওয়ার ভদ্রতা দেখাতে চাই না।কেকের দিকে মনোনিবেশ করাই আনন্দের।অন্তত কেক তো পেটের মধ্যে যাবে।সেখানে যেয়ে বলবে না, পথ ভুলে এসেছি!

প্লেনে ওঠার সময় কেন যেন মনে হল, এই ফ্লাইটে ওঠা উচিত হবে না।হয় প্লেন ক্রাশ করবে নয়তো অন্য কোন অঘটন কপালে আছে। প্লেন হাইজ্যাক হতে পারে। কিংবা মাঝ আকাশে আমি স্ট্রোক করলাম।এবং কোন ডাক্তারও নেই।

কপালে হাত দিলাম। ঘামছি।

পকেটে রুমাল তো রাখিনা।হাত দিয়ে মুছলাম, জমে যাওয়া ঘাম।বুক ধড়ফড় শুরু হয়েছে। ব্যাপারটা অনেক অনেক বছর আগে হতো।বুড়োকালে এমন অস্থির ভাব ঠিক না, পালপিটেশন স্ট্রোকের প্রথম ধাপ হতে পারে। এখন গোটা পঞ্চাশেক শহর দেখা বাকি।সেটা শেষ করা জরুরি। আমি পৃথিবী ঘুরে দেখার কথা দিয়েছিলাম। সেটা শেষ না করে দুনিয়া ছাড়তে নারাজ।

ছেলে দুটো যখন আর ছোট ছিল, ওদের গল্প শোনাতাম– মুনিয়ার কথা।আমাদের কথা। প্রথম দেখার কথা।

ভাবতে ভাবতে সিটে যেয়ে উঠবো। আরেকজনের সিটে চড়ে রামাদি যাচ্ছি। স্বাভাবিকভাবেই জানালার পাশে জায়গা হবে না। মুগ্ধ হয়ে আকাশ দেখা, তাতে হারিয়ে যাওয়া, উড়ে যাওয়ার অনুভুতি আমি মুনিয়ার কাছ থেকে শিখেছিলাম।সেটা এই যাত্রায় হচ্ছে না।

দোয়া ইউনুস পড়া জরুরি।মনে করতে পারছি না। আব্বার কাছ থেকে শেখা কোন জিনিষ অজ্ঞাত কারণে বিপদের সময়ে মনে করতে পারি না।

বছরের পর বছর এই সফল মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকার ফলই হয়তো তাই। আমি কী চাই আর তিনি কী চান, সেই নিয়ে অন্ততকাল ধরে আমাদের বিবাদ চলে আসছে।চলবে।চলুক। তবু তিনি বেঁচে থাকুক। অন্তত কারও সঙ্গে আপন ভেবে দুটো কথা বলার সুযোগ থাকবে।

কচি বয়সে বেকায়দা প্রথম বিয়ে নিয়েও তিনি নাখোশ ছিলেন। তখনও তাঁর কাছে আমি বকলম ছিলাম। এখন পঞ্চাশের ঘরে নেমেও আমি নেহাদ অপদার্থ। তবে আব্বা এখন নরম হয়ে গেছেন। বয়সের ভারে হয়তো।

ছোট ভাই আদনান আব্বার সঙ্গে দেশে থাকেন। ওর ভরা সংসার। বাঙ্গালি পরিবার।মাঝে মাঝে দুপুরে ভুরিতে হাত বুলাতে বুলাতে ফোন দিয়ে বলে, ভাইসাব আজকে পদ্মার ইলিশ দিয়ে ভাত খাইলাম। কাঁচা মরিচে একটা কামড় দিতে গিয়ে আপনার কথা মনে হইলো।

আমি মনে মনে বলি– তুই ব্যাটা যতো বড় ইলিশ খাস তার থেকে বড় সাইজ মেলবোর্নে আসে ব্যাটা।ফারাক শুধু অ্যানার বেস্বাধের রান্না।

মুখে বলি –তাই, এখানটায় আসলে পড়ে তোর বউরে বলিস, আমার জন্য পাঠাতে। আম্মা দারুণ করে দোপেয়াজা করতো মনে আছে?

আদনান তখন বলবে, বেগুনের দোলমার কথা মনে হইলো ভাইসাব।আর বইলেন না তো, পেটের মধ্যে দুই টুকরা ইলিশ লাফালাফি করতেছে।

আমি ফোনের লাইন কেটে দেবো। মুখ স্বাভাবিক রেখে। ভিতরে ভিতরে কী যেন অনুভুতি হবে…………..যদি আম্মা থাকতো!যদি মুনিয়া সেদিন ফিরে না যেতো।যদি আমিও এগোতাম, অপেক্ষা করতাম!

এই এক ‘যদি’ জীবনেই যদি না থাকতো!

আতি পাতি ভাবছি, তখন পাশ থেকে এসে কেউ দাঁড়ালো। সেই ওলের সুগন্ধি। কোন কুক্ষণে সিঙ্গাপুর যাওয়া পথে এয়ারপোর্টে ওলে মশ্চাইরাজার কিনেছিলাম। সব সময় সেটাই তার লাগতো। আর আমার নাকে এসে ঢেকতো সেই মিশ্রণ সুগন্ধি।

তাকাতে থমকে গেলাম। বলেছিলাম প্লেনে উঠতে মন চাইছিল না।মুনিয়া।

কুড়ি বছর বাদে দেখা। কী বাবা!আমার বয়স শুধু বাড়ে। কানের গোড়ায় চাবালিতে পুরোদস্তুর সফেদ চুল নিয়ে দিব্বি ঘুরছি। আর এই মেয়েটা সেই আগের মতো আছে।অপরিচিত চোখে শুধু তাকালো। চিনতে পারেনি নাকি! সঙ্গে সঙ্গে গালের দাড়িতে হাত গেলো আমার। দাড়ির জন্য চিনতে পারেনি নাকি?

জানালার দিকে তাকিয়ে বললো– ওই সিটটা আমার।সঙ্গে ভদ্রতার হাসি।

বুঝলাম চেনেনি।চিনলো নাহ! আমাকে চিনতেই পারলো না!সাত বছরের প্রেম ভুলে হুট করে বিয়ে করেছিল।চিনবে কী করে?

উঠে গিয়ে দাঁড়ালাম।কল দিয়ে পানি চাইলাম। আবার ঘামছি।

সিট বেল্ট বাধতে বাধতে মুখ খানা স্বাভাবিক রাখতে বললো-ভাবছো চিনতে পারিনি।

এতোক্ষণ বাদে তাকানোর সাহস হল।মনে হল অন্তত কাল ধরে কল বেল বাজিয়ে চললে, এক ফোঁটা পানি মিলবে না। মারা যাওয়ার পর গোসলের পানি হয়তো মিলবে।বেঁচে থাকতে এরা আমার মুখে পানি তুলে দেবে না…।

অবশেষে মিললো।ঠান্ডা বরফের মতো পানি।আমি হাত বাড়াবো, ঠিক পাশ থেকে টুক করে পানির গ্লাসটা তুলে নিলো মুনিয়া।এটা তার আজন্মা অভ্যাস।আগেও করতো।এখনও।কিছু মানুষ পাল্টায় ।মৃত মানুষের পরিবর্তন হয় না।জীবিত হয়েও ভূতের মতো অন্য মানুষের মনে ঘর বাঁধে।অনধিকার চর্চার মতো।

মুনিয়া মেয়েটা তাই।

কুড়ি বছর আগেও ওই একই ভাবে তাকাতো।মায়া ভরা চোখ।হারানো যায় এক কথায়। কিন্তু ঘর বাঁধার যখন আসলো তখন পাড়ার সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর হাতটা তার বেশি পছন্দ ছিল।

সেই মুহু মুহু হাসিতে বুকের ভেতর ঝড় তুলে দেওয়া। হাত ধরে রমনা পার্কে ঘোরা আর চিনা বাদাম।

এই সেই, কতো কী?

সাত বছর এক সঙ্গে চলা ফেরা। এক সঙ্গে কতো দিন।কতো রাত! অথচ বিয়েটা হল কিনা……।

আজ অবদি জানতে পারিনি আমার দোষটা কি ছিল। আমি জিজ্ঞাসাও করিনি।

রুচিতে বাধেনি।

হঠাৎ দুই সারি আগের সিট থেকে একটি মেয়ে এলো।বললো-তার দুই লোকের মাঝের সিটটা পড়েছে। পাল্টাতে চাইকি না। এই যাত্রায় এই প্রথম কোন কিছু ভাল লেগে গেলো কেন জানি।উঠে গিয়ে জায়গা করে দিলাম।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই। যখন উঠলাম তখন নারিতা বিমানবন্দরে প্লেন চলেই এসেছে।

লাগেজ নিয়ে চেক আউট করবো।পেছন থেকে সেই পুরোন কন্ঠস্বর শুনলাম — একেবারেই ভুলে গেছো দেখছি নাসের?

পেছনে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন মনে করলাম না।মুচকি হেসে মাথা নাড়লাম।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

লিভারপুল দুর্দান্ত এক মৌসুম পার করছে। যেখানে প্রিমিয়ার লিগে একের পর এক ম্যাচে জিতে চলেছে... আরও পড়ুন

প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে

ভোলার বোহানউদ্দিনে আজ ‍রবিবার দুপুরে সংঘর্ষের ঘটনাটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন—একটি হিন্দু ছেলের ফেইসবুক... আরও পড়ুন

ছেলের ফেইসবুক আইডি

সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়দের একজন লিওনেল মেসি। ক্লাব ফুটবলের হয়ে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন... আরও পড়ুন

বার্সেলোনার হয়ে

  নির্ধানিত ১২০ ঘন্টা যুদ্ধবিরতির পর কুর্দি যোদ্ধারা যদি প্রস্তাবিত নিরাপদ এলাকা ছাড়তে না চায়... আরও পড়ুন

দেবেন বলেন হুঁশিয়ারি

ক্যাসিনো কান্ডের সঙ্গে জড়িত না এমন কাউন্সিলরদের হয়রানি না করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার... আরও পড়ুন

রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি

তালিকা থেকে মৃত ভোটারদের কর্তন করা এক একটা সমস্যা বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)... আরও পড়ুন

ভোটার একটা

এবারকার ব্যাটম্যান সিরিজে দেখা যাবে টোয়াইলাইট খ্যাত অভিনেতা রবার্ট প্যাটিনসনকে।ম্যাট রিভসের পরিচালনায় কেপড ক্রুসেডর সিনেমাটিতে... আরও পড়ুন

ভোলার বোরহানউদ্দিনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত হয়েছে।গুলিবিদ্ধ আরও নয়জনকে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল... আরও পড়ুন

বাংলা মেডিক্যাল কলেজ

দারুণ এক ম্যাচে দুই গোল আদায় করে জয় তুলে নিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের... আরও পড়ুন

হারিয়েছে ২-০ গোলের

লা লিগায় বড় ধরনের বিপদে পড়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। তারা হেরে গেছে রিয়াল মায়োর্কার কাছে। যে... আরও পড়ুন

শীর্ষ স্থান থেকে নিচে

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।