ইনকা সভ্যতা: রহস্যেঘেরা বিচ্ছিন্ন এক মানবসভ্যতা

রিডার:: নিতি চাকমা

বৃহস্পতিবার, ৯ মে, ২০১৯ ১২:৫৪:৩৪ অপরাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  
এখনও এক বড় বিস্ময়!

মিসরের পিরামিডের নির্মাণশৈলী যেমন আধুনিক মানুষকে বিস্মিত করে, ঠিক তেমনি ইনকা সভ্যতার স্থাপত্যশৈলী এখনও এক বড় বিস্ময়! অন্যান্য সভ্যতা আরেক সভ্যতার সংস্পর্শে এসে নতুন কিছু শিখেছিলো, কিন্তু অন্য সব সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন এই ইনকা সভ্যতা যা করেছিল নিজে নিজেই করেছিল।

স্থাপত্যবিদ্যা থেকে শুরু করে জ্যোতির্বিজ্ঞানেও রয়েছে এর অবদান। আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে কি করে তারা এত উন্নত সভ্যতা গড়েছিল! কিভাবে নির্মাণ করেছিল বিশ্বের সপ্তাচার্যের একটি ‘মাচু পিচু’ নগরী! একমাত্র আকাশপথ ছাড়া কোনোভাবেই আক্রমণ করা সম্ভব ছিলো না যে নগরী, তা কীভাবেই বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হলো! চলুন জেনে নেওয়া যাক ইনকা সভ্যতার আদ্যোপান্ত।

ইনকা সভ্যতার ইতিহাস

ধারণা করা হয়, আমেরিকার অন্যান্য জাতির লোকদের মতো ইনকা সভ্যতার পূর্বসূরিরা বেরিং প্রণালী পার হয়ে এশিয়া থেকে আমেরিকা মহাদেশে আসে। আনুমানিক ১১০০-১২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এদের একটি দল দক্ষিণ আমেরিকার অন্দিজ পর্বতমালার পেরুর উচ্চভূমির দিকে চলে আসে এবং এখানকার কুজবেন নামক স্থানে বসতি স্থাপন করে।

স্থানের নামানুসারে এদের বলা হতো কেচুয়া জাতি। এরা এই অঞ্চলে জঙ্গল কেটে কৃষিভূমি উদ্ধার করে চাষাবাদ করতে থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় এ জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলে একটি রাজত্ব গড়ে তোলে।

প্রতিবেশী ছোটো ছোটো  গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধের সূত্রে এদের ভিতরের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধারা সমাজে সম্মানিত এবং ক্ষমতাধর হয়ে উঠে আর এই সকল যোদ্ধারা সমাজের শাসক হত।

যে সমাজের শাসক হয় বীর সেই সমাজ বা জাতি যুদ্ধবাজ হবেই এবং হয়েছিলোও বটে। এরপর এই সকল যোদ্ধাদের সমর্থনে কেন্দ্রীয় নেতার উদ্ভব হয়েছিল যা আধুনিক সময়ে আমরা রাষ্ট্রগত চিন্তা বলি।

ধীরে ধীরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই ব্যক্তি ‘কাপাক’ (capac) নামে অভিহিত হতে থাকে যার অর্থ ‘শাসক’ এবং মানুষ কেন্দ্রিয় সরকার বা ব্যবস্থার সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

এই কেন্দ্রিক সরকারের অধীনে ধীরে ধীরে এদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং ধীরে ধীরে এদের বসবাসের এলাকা বৃদ্ধি পায় যা পুরো ল্যাটিন আমেরিকা এমন কি উত্তর আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। এই সময় অন্যান্য ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে পরে এবং ক্রমেই আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে।

ইনকা সাম্রাজ্যে অনেক নগরী গড়ে তোলা হয়েছিল। যথা : কুজকো, করিক্যাঞ্চা, ওল্লান্টায়টাম্মো, মাচু পিচু ইত্যাদি। এর মধ্যে মাচু পিচু সবচেয়ে আলোচিত এবং এখনও পর্যন্ত মানবসৃষ্ট অসাধারণ সৌন্দর্যের নীলা ভূমি।

মাচুপিচু

সময়টা ১৪৫০ সাল। চলছিল ইনকা সভ্যতার এক স্বর্ণযুগ। ধারণক করা হয় এই সময়েই নির্মিত হয়েছিল মাচু পিচু নগরী। কাপাক (শাসক) পাচুকুটি (pachukuti) (১৪৩৮-১৪৭২)এই বিখ্যাত নগরী পত্তন করেন।

এই নগরীটি কেন তৈরি করা হয়েছিল তা নিয়ে আছে নানা জনের নানা মত। অনেকে মনে করেম নগরীটি ছিল সম্রাটের (পাচুকুটির) নিজস্ব সম্পদ। এখানে একটি শক্তিশালী দূর্গ তৈরি করা হয়েছিল। তাছাড়া এটি শীতকালীন রাজধানী হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। আবার অনেকে মনে করেন মাচু পিচু ধর্মীয়ভাবে পবিত্র স্থান ছিল।

তবে কেউ কেউ বলেছেন, এটি আসলে ইনকা সম্রাটদের নির্মিত জেলখানা, যেখানে ভয়ংকর সব অপরাধীদের রাখা হতো। মাচু পিচু নিয়ে যত গবেষক কাজ করেছেন বা করছেন তাদের মধ্যে জল রো এবং রিচার্ড বার্গার ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তাদের মতে মাচু পিচু ছিল সম্রাটদের অবকাশ কেন্দ্র।

স্পেনীয় উচ্চারণে শহরটির নাম মাচু পিচু হলেও অনেকেই এর নাম উচ্চাররণ করেন মাচু পিকচু হিসেবে, যার অর্থ ‘পুরানো চূড়া’। প্রকৃতপক্ষেই বেশ প্রাচীন শহর এটি। এমনকি কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারেরও আগের শহর এই মাচু পিচু।

সমতল থেকে প্রায় ১৮০০ ফুট ও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে  প্রায় ২৪০০ মিটার বা, ৭,৮৭৫ ফুট উঁচু এই শহর। এটি পেরুর ‘উরুবাম্বা’ নামক এক উপত্যকার ওপরে পর্বত চূড়ায় অবস্থিত।

যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল ইনকা সাম্রাজ্য

ইনকা সভ্যতা ধ্বংসের জন্য দায়ী করা হয় স্প্যানিশ নাবিক ফ্রানসিসকো পিজারোকে। ১৫২০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে পরপর দুটো অভিযান চালান। এই সময় তিনি ইনকাদের সাম্রাজ্যের প্রবেশ করেন। তিনি  ষড়যন্ত্র করে কিছু ইনকা জাতির লোককে বন্দী করেন এবং সেই সাথে প্রচুর সোনাদানা এবং লামা নিয়ে স্পেনে ফিরে আসেন।

এরপর পিজারো স্পেনের তৎকালীন রাজা পঞ্চম চার্লস-এর কাছে পেরু দখল এবং সেখানকার শাসক হওয়ার অনুমতি চান। রাজা পঞ্চম চার্লস পিজারোকে এই অভিযানে অনুমতি দেন ।

১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বর্তমান পেরুতে পৌঁছান। ১৭৭ জন সৈন্য ও ৬২টি ঘোড়া নিয়ে কাজামারকা শহরে যাত্রা করেন। সে সময়ের ইনকা সম্রাট তখন আটাহুয়ালপা কাজামারকা শহরে অবস্থান করছিলেন।

পিজারো কাজামারকা শহরের কাছে এসে ইনকা সম্রাটের কাছে স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা অনুমতি প্রার্থনা করেন। সম্রাট তাঁকে ঘোরাফেরার অনুমতি দিলে,  ১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই নভেম্বর তিনি শহরে প্রবেশ করেন। ১৬ই নভেম্বর তিনি শহরের একটি খোলা জায়গায় আটাহুয়ালপা ও ইনকা অভিজাতদের ভোজে নিমন্ত্রণ করেন।

ইনকা সম্রাট এবং অভিজাত শ্রেণির লোকেরা সরল বিশ্বাসে প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় নিমন্ত্রণ রক্ষা করার জন্য আসেন।

এরপর স্প্যানিশ সৈন্যরা তাঁদের ঘিরে ফেলেন এবং সম্রাট ছাড়া সকল অতিথিদেরকে হত্যা করে। এরপর পিজারো সম্রাটের মুক্তি পণ হিসেবে এক ঘর ভর্তি সোনা আর দুটি ঘর ভর্তি রূপা দাবি  করেন। রাজ্যের অভিজাতরা পিজারোর সেই দাবি মেনে নেওয়ার পরও সম্রাটকে হত্যা করেন।

সম্রাটের মৃত্যুর পর ইনকাদের প্রতিরোধ করার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে, পিজারো ইনকার রাজধানী কুজকো দখল করে নেয়।

ইনকা সাম্রাজ্যে স্প্যানিশদের দখলে আসার পর, এরা সমগ্র অঞ্চল জুড়ে হত্যা, লুণ্ঠনের তাণ্ডব চালায়। ইনকাদেরকে দাস হিসেবে বিক্রয়ের কার্যক্রম চালায়।

পুরো পেরু অঞ্চল দখলে আসার পর, ১৫৩৫ খ্রিষ্টাব্দে পিজারো লিমা নামে একটি নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করে এবং এই শহরে রাজধানী স্থাপন করে, পেরু শাসন করা শুরু করে।

এই সময় কৌশলী পিজারো, সম্রাট আটাহুয়ালপা-কে হত্যা করলেও, তার আরেক ভাই মানকো কাপাককে সিংহাসনে বসায়। ইতিমধ্যে লুটেরা স্প্যানিশদের মধ্যে স্বর্ণরৌপ্যের ভাগাভাগি নিয়ে হাঙ্গামা বাধে। মানকো তাদের এই হানাহানির সুযোগ নিয়ে পালিয়ে গিয়ে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ভিলকা বাম্বায় আশ্রয় নেয় এবং নতুন রাজধানী পত্তন করে। ১৫৪১ খ্রিষ্টাব্দে পিজারো ৬৬ বছর বয়সে লিমায় নিজ প্রাসাদে খুন হন।

মানকো কাপাক  ভিলকা বাম্বায় থেকে স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে গুপ্ত যুদ্ধ পরিচালনা করা শুরু করেন। দীর্ঘদিন ধরে এই যুদ্ধ চলার পরও স্প্যানিশরা ভিলকা বাম্বার অবস্থানই জানতে পারে নি। ১৫৭২ খ্রিষ্টাব্দে স্প্যানীয়রা ভিলকা বাম্বার অবস্থান খুজেঁ পায় এবং মানকো-কে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। মূলত এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সর্বশেষ ইনকা সম্রাট ও তার সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে যায়।

সে সময় ইনকাদের রাজধানী ছিল কোস্কো। রাজধানী কোস্কো থেকে মাত্র ৮০ কি.মি. দূরেই অবস্থিত ছিল মাচুপিচু শহরটি। স্পেনীয়রা যখন ইনকা রাজ্য আক্রমণ করে তখন তারা এ শহরের কথা জানত না। ফলে অন্যান্য ইনকা নগরীর মত এ শহরটি তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয় নি। ফলস্বরুপ এ শহরে লুটপাটের কোন ঘটনাও ঘটেনি। এরপর অনেক বছর এ শহর জন মানবহীন ছিল। ফলে শহরটি ধীরে ধীরে ঘন জঙ্গলে পরিনত হয় এবং ঢেকে যায়।

পুনরাবিষ্কার

১৬শ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত স্পেনীয়রা কখনই মাচু পিচু শহরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে অবগত ছিল না। স্পেনীয়দের এ আক্রমণের পর  কেটে যায় আরো চারশ বছর। চারশ বছর যাবৎ এই ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরটি লুকিয়ে ছিল বাইরের পৃথিবীর মানুষদের কাছে থেকে। অবশেষে ১৯১১ সালে আমেরিকান পুরাতত্ববিদ হিরাম বিংহাম এটির প্রতি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেন।

এখানকার অসাধারণ দুর্গগুলোর অস্তিত্ব তখন শুধু সেই এলাকার আশে পাশে বাস করা কিছু কৃষকই জানতেন। বিংহাম গুপ্ত ধনের উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান শুরু করেন ১৯০৯ সালে। এসময় তিনি তাঁর প্রথম অভিযানে বিফল হলেও দমে যাননি। আবার ইতিহাস ঘেঁটে শুরু করেন দ্বিতীয় অভিযান।

পথে দেখা হয় এক ইন্ডিয়ানের সাথে। তার সহযোগিতায় উরুবাম্বা থেকে ২,০০০ ফুট উপরে প্রাচীন এই শহরটির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান বিংহাম।

মাচুপিচু অনেক প্রাচীন স্থাপত্যবিদ্যার স্বাক্ষর বহন করে। এখানকার স্থাপনাগুলোর দেয়াল পাথর নির্মিত। মজার বিষয় হল পাথরগুলো একে অপরের সাথে জোড়া দেয়ার জন্য কোন রকম সিমেন্ট বা, চুন-সুরকির মিশ্রণ ব্যবহৃত হয়নি। তাদের এই নির্মাণ কৌশলকে বলা হয় অ্যাশলার।

এ কৌশলে তারা বেশ দক্ষ ছিল। এই পদ্ধতিতে পাথরের খন্ড কাটা হত খুব নিখুঁতভাবে। তারপর তাদের খাঁজে খাঁজে বসিয়ে দেয়া হত। ফলে সংযোগকারী সিমেন্টের কোন প্রয়োজন ছিল না। তাদের এই পদ্ধতিতে ইনকারা অত্যন্ত দক্ষ ছিল। তাদের নির্মিত পাথর এতই সুনিপুণ হতো যে একটা পাতলা ছুরির ফলাও দুই পাথরের মধ্যবর্তি ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করানো কার্যত অসম্ভব।

পেরু বেশ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। সাধারণ সিমেন্টের জোড়া হলে এই ভূমিকম্পে স্থাপনাগুলো টিকত না। কিন্তু পাথরের খাঁজে খাঁজ বসিয়ে তৈরি করা বলে মাচুপিচুর এই স্থাপনাগুলো বেশ ভূমিকম্পপ্রতিরোধী। এ কারণেই ইনকাদের এই শহর গত ৪০০ বছরে অসংখ্য ভূমিকম্প সহ্য করেও বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে।

আশ্চর্যের বিষয় ইনকা সভ্যতায় চাকার দেখা পাওয়া যায় না। তারা কখনই তাদের ব্যবহারিক কাজে চাকার ব্যবহার করেননি। কিন্তু তাহলে কিভাবে ইনকারা এত বিশাল বিশাল আকৃতির পাথর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলো?

তা এখনও এক বিশাল রহস্য। যদিও মনে করা হয় এই পাথরগুলো পাহাড়ের সমতল ঢাল দিয়ে ঠেলে ঠেলে ওপরে তোলা হয়েছিল। আর এ কাজে তারা ব্যবহার করেছিল শত শত শ্রমিক।

কিছু কিছু পাথরের গায়ে হাতলের মতো গাঁট দেখতে পাওয়া যায়। এমন হয়ে থাকতে পারে যে, এ গাঁটগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল পাথরগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে বসাতে। পাথরগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে বসানোর পর হয়ত হাতলগুলোকে গুড়িয়ে সমান করে দেয়া হয়েছিল।

বর্তমানে এই মাচু পিচু শহরটিই ইনকা সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত শহর। ১৯৮১ সালে এই এলাকাকে পেরুর সংরক্ষিত ঐতিহাসিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় স্থান দেয়। বর্তমানে এটি বিশ্বের সপ্তাশ্চার্যের একটি।

এই ছিল ইনকার ইতিহাস ও বিলুপ্তির কারণ। কিন্তু কেম্ন ছিল ইনকাদের জনজীবন, খাদ্যাভাস, সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

ইনকার শাসককুল
কেচুয়া জাতির লোকেরা মূলত সূর্যের উপাসক ছিল। কেচুয়া জাতির লোকেরা এক সময় তাঁদের নেতাকে সূর্যপুত্র ভাবতো। সম্ভবত ইনকা শাসকরা নিজেদেরকে এইভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

ইনকার সভ্যতার পিরামিড

সেই সাথে যোগ দিয়েছিল ইনকা ধর্মের পুরোহিতরা। সূর্য দেবতার নামানুসারে সম্রাট নাম পেয়েছিল ইনকা। সম্রাট বিবাহ করতেন আপন বোনকে।

তবে রাজ্যের সুন্দরী নারী উপহার পেলে, উপপত্নী হিসেবে তিনি গ্রহণ করতেন। এই কারণে প্রত্যেক সম্রাটের একটি প্রধান স্ত্রী থাকতো। সম্রাটের বড় ছেলে সম্রাট হতেন।

ইনকার শাসককুলের প্রধান ছিলেন সম্রাট। এরপরের ক্ষমতাধর ছিলেন অভিজাত শ্রেণি, ইনকার পুরোহিতকূল এবং সেনাপ্রধানরা। রাজধানীতে সম্রাটের ক্ষমতা যতটা ছিল, রাজধানী থেকে দূরের এলাকাগুলোতে তটটা ছিল না। দূরবর্তী অঞ্চল শাসন করতেন অভিজাত শ্রেণি, ইনকার পুরোহিতকূল এবং সেনাপ্রধানরাই।

পুরো সাম্রাজ্য কতকগুলো প্রদেশে বিভাজিত ছিল। প্রাদেশিক শাসক হিসেবে সর্বোচ্চ পদে থাকতেন সামরিক বাহিনীর প্রাদেশিক অধিকর্তা এবং প্রাদেশিক পুরোহিত প্রধানরা।

এদেরকে বিশেষভাবে সহায়তা করতেন অভিজাতশ্রেণির পরিবারগুলোকে। এঁরা অর্থ-সম্পদ দিয়েপুরোহিতকূল এবং সেনাপ্রধানদের সন্তুষ্ট রাখতেন। পুরোহিতকূল এবং সেনাপ্রধানরাও অভিজাতশ্রেণিকে নানাভাবে সমর্থন করতেন।

ইনকাদের খাদ্যাভ্যাস 
ইনকাদের আদিপুরুষরা শিকারী ছিল। পরে এরা ধীরে ধীরে কৃষিজীবী হয়ে পড়ে। এদের প্রধান খাদ্য ছিল ভুট্টা ও আলু। এরা ভূট্টা থেকে এক ধরনের পানীয় তৈরি করে খেত। এই পানীয়ের নাম ছিল চিচা। পেরুতে এটি এখনো জনপ্রিয়। এছাড়া ওল, নীল শ্যাওলা, কাঁচা মরিচ খেতো। মাংসের মধ্যে ছিল গিনিপিগ ও ছাগল জাতীয় লামার মাংস।

সাগরের নিকটবর্তী এলাকার মানুষ সামুদ্রিক মাছ খেতো।  ইনকাদের বড় সাফল্য ছিল খাদ্য সঞ্চয়ে। সমগ্র সাম্রাজ্য জুড়ে অসংখ্য সরকারি খাদ্যভাণ্ডার ছিল। এছাড়া সাধারণ মানুষকে খাদ্য সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় এদের প্রায় ৫-৭ বছরের খাদ্য মজুদের ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। শস্য ছাড়াও তারা মাংস শুকিয়ে নোনা করে রাখতো।

ইনকাদের সমাজব্যবস্থা
ইনকারা দারুণ সামাজিক ছিল। এই কারণে সামাজিক রীতিনীতিকে তারা প্রাধান্য দিত। রাজা নিজের বোনকে বিবাহ করলেও, সাধারণ ইনকাদের ভিতরে এই জাতীয় কোনো বিধি ছিল না।

এরা আপন বোন ছাড়াও অন্য যে কোনো কন্যাকে বিবাহ করতে পারতো। এক্ষেত্রে ইনকা ছেলেদেরকে কুড়ি বছর বয়সের আগে কন্যা পছন্দ করতে হতো। কোনো ছেলে কনে খুঁজে না পেলে, অভিভাবকরা কনে খুজে দিত। অনেক সময় কোনো কোনো অভিভাবক তার পুত্র সন্তানের জন্য কন্যা পছন্দ করে রাখতো।

কন্যার অভিভাবকরা তাতে রাজি হলে, ওই কন্যা বাগদত্তা হিসেবে অন্য কারো সাথে বিবাহ করতে পারতো না। বিবাহের দিন বর-কনে পরস্পরের হাত ধরে চন্দন বিনিময় করতো। এরপর বিবাহ উপলক্ষে সামাজিক ভোজ হতো। কিন্তু রাজ্যের সুন্দরী মেয়েদের অনেক সময় রাজার উপপত্নী করার জন্য পাঠানো হতো। এ বিষয়ে স্থানীয় পুরোহিত এবং সেনাশাসকদের বিশেষ ভূমিকা থাকতো।

ইনকাদের স্থাপত্য-কৌশল
ইনকারা অত্যন্ত সামাজিক ছিল। সেই কারণে এদের ভিতরে যৌথ পরিবারে প্রথা প্রচলিত ছিল। সাধারণ মানুষ ঘরের দেওয়াল তৈরি করতো পাথর, মাটি, ঘাস ইত্যাদি দিয়ে। কাদামটি, খড়, ঘাস ইত্যাদি দিয়ে ছাদ তৈরি করতো। ছাদগুলো ছিল বাংলাদেশের দোচালা বা চারচালা ঘরের মতো।

 দেয়ালে বায়ু চলাচলের জন্য ছোটো ছোটো চৌকো ফোঁকর ছিল। এই ঘরগুলো খুব বেশি মজবুত হতো না। ধনী পরিবারগুলোর ছিল বড় বড় প্রাসাদ। এগুলো মজবুত করে তৈরি করা হতো।

ইনকা সভ্যতার নমুনা সবচেয়ে ভালো অবস্থায় পাওয়া গেছে মাচু পিচু নগরীটিতে। দুই পর্বতশৃঙ্গের মধ্যবর্তী বন্ধুর উপত্যাকার ভিতরে পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে এই শহর তৈরি করা হয়েছিল। এখানে ছিল দীর্ঘ সিঁড়িপথ, বিশেষ ব্যবস্থায় তৈরি করা কৃষিভূমি, জলনিষ্কাষণ এবং পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা।

ইনকাদের সূর্যদেবতা

এই বিশাল সাম্রাজ্যের ভিতরে যোগাযোগ রক্ষার প্রধান ব্যবস্থা ছিল, সড়কপথ। পুরো সাম্রাজ্য জুড়ে এরা সড়ক তৈরি করেছিল প্রায় ১৪ হাজার মাইল।

এই পথকে বর্তমানে বলা হয় ইনকা ট্রেইল। এই পথ ছিল মূলত পায়ে চলার উপযোগী। তবে স্থান বিশেষে মালামাল পরিবহনের উপযোগী গাড়ি চলাচলের জন্য রাস্তাও ছিল। স্থানের বৈশিষ্ট্য অনুসারে এই পথের প্রকৃতি নানাস্থানে নানা রকমের ছিল। সমতলভূমিতে বড় বড় পাথর বা কোথাও নুড়ি বিছিয়ে পথের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করতো।

ফলে বর্ষার সময়েও কাদা এবং পিচ্ছিল অবস্থা থেকে পথচারী মুক্তি পেতো। পাহাড়ি অঞ্চলে এই পথ তৈরি করা হতো সিঁড়ি।

কোথাও কোথাও ব্যবহৃত হতো প্রাকৃতিক পাহড়ি সমতলধর্মী বন্ধুর পথ। এই পথে সামরিক ও বেসামরিক সকল লোকই চলাচল করতো।

ইনকাদের ধর্মবিশ্বাস
ইনকাদের প্রধান দেবতার নাম ছিল ভিরাকোকা। ইনকারা এই দেবতাকে তাদের জগৎস্রষ্টা হিসেবে মনে করতো। তবে সূর্য দেবতা ইনতি ছিল বিশেষ মর্যাদার দেবতা। ইনতির সন্তান হিসেবে এরা নিজেদেরকে ইনকা বলতো।

এরা উচু কোনো পাহাড়ের উন্মুক্ত স্থানে পাথরের বেদী তৈরি করতো। এর উপরে সূর্যদেবতার প্রতীকী মূর্তি রাখা হতো। সূর্যমন্দিরের দায়িত্বে থাকতেন একজন প্রধান পুরোহিত এবং তাঁর কিছু সহযোগী পুরোহিত। এই মন্দিরকে বলা হতো ইনতি।

মানব সভ্যতায় ইনকাদের অবদান

*ইনকারা মুদ্রা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে।
*দেওয়াল নির্মাণে আমূল পরিবর্তন আনে।
*বাধানো রাস্তার ব্যাবহার তারা-ই শুরু করেছিলো।
*খাদ্য প্রস্তুত এবং সংরক্ষণীয় বিদ্যায় পারদর্শী ছিল।

নানা কল্পনা জল্পনায় ঘেরা ইনকা সভ্যতা। মাচু পিচুর ধ্বংসাবশেষ পুরো পৃথিবীর মানুষের কাছে এক বিস্ময়কর স্থাপত্যবিদ্যার নিদর্শন। প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটকদের সমাগমে মুখরিত হয় মাচু পিচু।

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

শেষ কবে প্রযোজককে ক্ষতির হিসাব দিয়েছেন অক্ষয় কুমার নিজেই হয়তো বলতে পারবেন না। টানা পাঁচ... আরও পড়ুন

উপহার দিয়ে আসছেন

বিশ্বের সর্বচেয়ে বড় বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যামাজান প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জেফ বেজোসের... আরও পড়ুন

সিটি নির্বাচনে রাজধানীর গাবতলীতে গণসংযোগের সময়ে হামলার অভিযোগ করে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে নির্বাচন কমিশন... আরও পড়ুন

দিয়ে নির্বাচন কমিশন

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে সশস্ত্রবাহিনীকে মাঠে নামাবে না নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল মঙ্গলবার... আরও পড়ুন

বৈঠক শেষে নির্বাচন

আসন্ন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন অংশগ্রহনমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হবে... আরও পড়ুন

প্রকাশ করেছেন মার্কিন

চট্টগ্রাম-৮ আসনে ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালটা পুনর্র্নিবাচনের দাবি জানিয়েছেন বিএনপি'র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ... আরও পড়ুন

আমীর খসরু

আসন্ন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার না করে... আরও পড়ুন

ব্যবহার না করে ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহনের

আসন্ন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনি এলাকার শিল্প কারখানা... আরও পড়ুন

নির্বাচন কমিশন (ইসি)

বিভিন্ন সংগঠনের দাবির মুখে অবশেষে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ৩০ জানুয়ারি পরিবর্তে... আরও পড়ুন

আগামী ১ ফেব্রয়ারি

সরস্বতী পূজা এবং ভোট নিয়ে যাতে কোন ধরণের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি না হয়-সেটি বিবেচনায় নিয়ে... আরও পড়ুন

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

প্রাচীন শহরের সন্ধান মিলল ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায়

পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় ১৩ হাজার ফুট উঁচুতে প্রচীন এক শহরের সন্ধান পেয়েছেন ইতিহাসবিদরা। ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায় কিভাবে মানুষ বসবাস করতেন তা ইতিহাসবিদদের ভাবিয়ে তুলেছে। সম্প্রতি ওই শহরের সন্ধান পাওয়া যায় বলে জানায় আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো। এ বিষয়ে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের... আরও পড়ুন