আমি তাঁকে পাল্টে দিতে চেয়েছিলাম

রিডার::ফারজানা জামান(অনুবাদ)

শুক্রবার, ২৪ মে, ২০১৯ ০৮:৩৮:৫৫ অপরাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  
ঔপনিবেশিক ভারতের

সাইদ জাফরি

আমার বয়স তখন ১৯। মেহরুনিমার বয়স হবে কতো…… ১৭। চল্লিশের দশকে শুরুতে আমাদের বিয়ে হয়, পারিবারিকভাবে।

ঔপনিবেশিক ভারতের শাসন আমলেও  ব্রিটিশ সংস্কৃতিতে আমি বরাবরই বি‍মুগ্ধ ছিলাম। আমি এই সংস্কৃতিটাকে নিজের ভাবতে চাইতাম।

তাই হয়তো ইংরেজি ভাষাটা নখদপর্ণে ছিল। আপাদমস্তক ‘সাহেব’ হয়ে চলা-ফেরা করতাম। শিষ্ঠাচারেও যেন ব্রিটিশ আমি। আমার ভাল লাগতো।

আমি নিজের স্ত্রীকে সেইভাবে চাইছিলাম।স্টাইলাইশ, স্মার্ট, কথায় কথায় ব্রিটিশদের মতো উচ্চারন, একটু সংবেদনশীল, একটু সৌন্দর্যমনা।

কিন্তু মেহরুনিমা যেন আমার বিপরীত মুখের মানুষ।ঘরোয়া, আপাদমস্তক ভারতীয় গৃহিনী।

একটু বেশি অনুগত, একটু বেশি ভারতীয় সংস্কৃতির নারী।

আমার সব পরামর্শ তার শিরধার্য হলেও তাতে তাঁর মৌলিক ব্যক্তিত্বে বড় কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি। কখনই না।

মেহেরুনিমা যেন একজন অনুগত স্ত্রী, আদর্শ মা আর অসাধারণ গৃহিণী। যেভাবেই হোক না কেন, স্ত্রীকে আমি যেমনটা চাইছিলাম তার ছিটে ফোঁটা ওঁর মাঝে ছিল না।

আমি তাঁকে আমার ছাঁচে পাল্টাতে চাইলাম।বার বার। বহুবার। কখনও পোশাক-আশাকে, কখনও আচরনে।

আর যতোই পরিবর্তন আনতে চাইলাম আমাদের দূরত্ব বাড়তে লাগলো।ধীরে ধীরে সেই প্রেমময় শান্ত-সাবলিল নারী কখন যে অচেনা হয়ে উঠলো টাহর করতে পারেনি।যার মাঝে আমাকে নিয়েই ছিল যতো যন্ত্রণা, হারানোর ভয়।

ওই সময়টায় আমার এক সহকর্মীকে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম। বার বার। যেন তার মাঝেই নিজের স্ত্রীকে খুঁজছিলাম।

বিয়ের দশ বছরের মাঝে সম্পর্কটা আর ধরে রাখার ক্ষমতা আমার মধ্যে ছিল না।একদম পারছিলাম না।

মাত্র ২৯ বছর বয়সে মেহেরুনিমাকে তালাক দিলাম। তখন ওঁ কতো হবে, ২৭!

লন্ডনে নিজের থাকার ঘর ছাড়লাম, পরিবারও তাই আমাকে ছেড়ে দিল। কিন্তু মেহেরুনিমা আর বাচ্চাদের দায়িত্ব থেকে কিন্তু আমি সরে যাই নি।

আমি আমার সেই সহকর্মী জেনিফার জাফরিকে বিয়ে করে ফেললাম।

প্রথম ৬-৭ মাস মধুচন্দ্রিমা কাটছিল।

জেনিফারে আমি বিমোহিত। জেনিফার আমায়।

এরপরই যেন কী হল!আমি বুঝতে শুরু করলাম, নতুন স্ত্রী আমার সেই রকম খেয়াল রাখছে না, যাতে আমি এতোকাল অভ্যস্ত ছিলাম। উপর দিকে ব্রিটিশ নাগরিক হলে কী হবে, অন্তরে তো সেই ভারতীয় পুরুষ।

 

জেনিফার তাঁর সৌন্দর্য, ক্যারিয়ার আর মোহ নিয়ে দারুণ ব্যস্ত। ওঁর সময় কোথায়?

একটা সময় পরে একটু একটু করে মেহেরুনিমার স্পর্শ দারুণ অনুভব করতাম।আমার ভাল থাকা, মন্দ থাকা নিয়ে যার দিন পার হতো সেই খেয়াল রাখাটা, ভালবাসাটা বড় অনুভব করলাম।

কিন্তু একটু দেরিতেই যেন মোহ কাটলো।

তবুও জীবন চালিয়ে নিচ্ছিলাম।চালিয়ে নিতে হয় আরকি।

যেই বাড়িতে আমার দুটো মানুষ তো বাস করতাম, থাকতো না শুধু জীবনসঙ্গীর অনুভবটুকু।যেটা একে অপরের জন্য জরুরি ছিল।

এভাবেই চলছিল।দ্বিতীয় বিয়ে ৬-৭ বছরের মাথায় হঠাৎ একদিন পত্রিকায় মধুর জাফরি নামে এক পাচককে নিয়ে লেখা প্রতিবেদন পড়ছিলাম।

এক প্রতিশ্রুতিশীল পাচক।ধরে নেওয়া হচ্ছে আগামী দিনে রন্ধনশৈল্পীতে বড় কোন আলোড়ন তৈরী করতে পারবে সে। এমনটাই লেখা হয়েছিল প্রতিবেদনে। কিছুদিন আগেই তিনি রান্নার উপর একটি গোটা বই লিখে ফেলেছিলেন।

লেখাটা পড়তে পড়তে হঠাৎ সেই নারীর ছবিতে চোখ আটকে গেল।

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

এও কী সম্ভব।এযে মেহেরুনিমা!

আধুনিকা, পরিমীত নারীটি, আমার সেই………।কতো বদলে গেছে মেয়েটা।কিন্তু কেমন করে এমন পাল্টে গেলো মেয়েটা!

যেই মেহেরুনিমার এমন ‘চেহারা’ আগে কখনই দেখিনি। নাকি দেখার ব্যাপারে আগ্রহই ছিল না।

ওঁ বিয়ে করে আমেরিকায় সন্তানদের নিয়ে চলে গেছে।

সঙ্গে পাল্টে নিয়েছে ওঁর পুরোনো নামের প্রথম অংশ, মধুর জেফরি নামেই আজ সবাই তাঁকে চেনে।

প্রডাকশনের কাজে শুটে ছিলাম দেশের বাইরে।সবচেয়ে জলদি পাওয়া ফ্লাইট ধরে আমেরিকা গেলাম, এক নজর দেখার জন্য।

অনেক খুঁজে বের করলাম ঠিকানা। আজকাল মতো তখন তো এতো সহজে ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যেতো না। কিন্তু প্রথমে তো তিনি দেখা দিলেনই না।

 

মধুর জাফরি

ওঁর কাছে রেখে যাওয়া আমার মেয়েটার বয়স তখন ১৪, ছেলেটা ১২।

পরে শেষবারের মতো দেখা করতে চাইলে সন্তানদের নিয়ে তিনি আসেন আমার সামনে।ওঁর ঠিক পেছনে তখন দাঁড়িয়েছিল, ওঁর স্বামী।

তিনি তখন আমারই বাচ্চাদের আইনত পিতা।

আর সেদিন আমার সন্তানরা আমাকে যা বলেছিল আজ অবদি ভুলিনি। ভুলি বা কী করে!

ওরা বলেছিল-তাদের নতুন বাবা অন্তত জানেন সত্যিকারের ভালবাসার অর্থটা কি। তিনি মেহেরুনিমাকে তার মতো করেই গ্রহণ করেছিলেন।কখনও পাল্টে নিতে চাননি নিজের ছাঁচে।

কারণ মানুষটি নিজের থেকেও মেহেরুনিমাকে বেশি ভালবাসতেন।

একটা সময় পরে যে কাজটা মেহেরুনিমা বেশি ভালবাসতো তাই করতে তাকে অনুপ্রাণিত করেছেন-তাদের নতুন বাবা।

এমন কি এই ব্যাপারটা নিয়েও কোন চাপ তৈরী করেননি-তাদের নতুন বাবা।মেহেরুনিমা যেমন, তেমন করেই তাকে গ্রহণ করেছিলেন।আজ যা কিছু অর্জন করেছেন মেহেরুনিমা তা করেছেন সেই গ্রহণযোগ্যতা থেকে, সেই ভালবাসা থেকে।

 

(সাইদ জাফরি ভারতীয় বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ অভিনেতা।তিনি প্রথম ভারতীয় অভিনেতা যিনি শেক্সপিয়ারের নাটক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। তাঁর ঝুলিতে আছে সত্যজিৎ রায়, ডেভিড লিন, জন হাস্টন, জন ফ্রাংকেন হাইমার, ফ্রাংকলিন জে, শেফনার, রিচার্ড অ্যাটেবরো, স্টিফেন ফ্রিয়ার্সের মতো খ্যাতিমান পরিচালক ও শ্যন কনারি, মাইকেল কেইন, ডেনিয়েল ডেলুইস, ওমর শরিফ, পিয়ার্স ব্রসনানের মতো খ্যাতিমান অভিনেতার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা। সত্যজিৎ রায়ের ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’ ছবিতে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড জিতেছিলেন।তিনিই প্রথম ভারতীয় হিসেবে ‘অর্ডার অব দ্যা ব্রিটিশ এম্পায়ার’ সম্মাননায় ভূষিত হোন।২০১৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পরবর্তি সময়ে তাঁর ব্যবহৃত জিনিষ থেকে প্রাপ্ত একটি ডায়েরির লেখা জীবনের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে দেওয়া হয়।)

 

 

 

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

কৃষাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড হত্যা প্রতিবাদে ফুঁসছে গোটা যুক্তরাষ্ট্র। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে গোটা বিশ্ব সহমত প্রকাশ করেছে... আরও পড়ুন

বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে

করোনা ভাইরাসের মহামারির মধ্যে মাস্ক পরা নিয়ে আবারো সুর পাল্টে নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।... আরও পড়ুন

সংস্থাটির

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এখনও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে লগ ডাউন চলছে। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার... আরও পড়ুন

বিধিনিষেধের আওতায়

করোনা ভাইরাসের আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত লাখেরও বেশি বলে দাবি করেছে ব্রিটেনের সাময়িকী দ্যা... আরও পড়ুন

আর্ন্তজাতিক উদরাময়

জীবিকার তাগিদে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যে সবকিছু সচল করছে ভারত।আগামী সোমবার থেকে অফিস, শপিংমল, উপাসনালয়... আরও পড়ুন

অফিস, শপিংমল,

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রেকর্ড হারে বেড়ে যাওয়ায় কক্সবাজার জেলার কয়েকটি এলাকাকে ‘রেড জোন’ হিসাবে চিহ্নিত করে... আরও পড়ুন

৩৫ জনের সংক্রমণ ধরা

একবার ফের ইরানের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।আর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাওয়াদ জারিফ তদোত্তরে... আরও পড়ুন

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাওয়াদ

দুবছর আগে যে স্বপ্নময় যাত্রা শুরু করেছিলাম, তার বিদায়ঘণ্টা বাজছে।বান্দরবান থেকে বোস্টন- যাত্রাটা ছিল অবিশ্বাস্য,... আরও পড়ুন

করোনা ভাইরাসে সংক্রমণ ঠেকাতে টানা লগডাউনে চলছে সৌদি আরব। আর এতে ঘরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন... আরও পড়ুন

সৌদি পুরুষরাও।আর এতেই তাদের আসল

করোনায় আক্রান্ত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর শারীরিক অবস্থার খানিকটা অবনতি হয়েছে... আরও পড়ুন

খানিকটা অবনতি হয়েছে

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।