আমাদের সারওয়ার ভাই

বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৮ ০১:০০:৪২ অপরাহ্ন
  •  
  •  
  •  
  •  

ছবিটি ১৯৭৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের আর কে মিশন রোডস্থ বার্তা কক্ষে তোলা-লেখকের ফেসবুক থেকে নেয়া

রিডার::পিনাকি দাসগুপ্ত

গোলাম সারওয়ার ভাই কিন্তু দুটি নয়, এদেশের তিনটি দৈনিকের সম্পাদক।

দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক সমকাল, দৈনিক নবযুগ। আমার সৌভাগ্য তিনটির মধ্যে সমকাল ও নবযুগের ডিক্লারেশনের সিংহভাই আমার হাত দিয়ে। নবযুগের প্রকাশকও ছিলেন তিনি । ইচ্ছা ছিল নবযুগকে তিনি নিজের মত করেই গড়ে তুলবেন।

নানা কারণ (!), সেই সাথে এক পর্যায় শরীর তাকে বাধ সাধে।

সেই ১৯৯৯ সাল, মাস অক্টোবর। দৈনিক যুগান্তরে চাকরির সময় ইন্টারভিউতে শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমার নামের অর্থ কি। সেখান থেকেই তার সাথে আমার পথ চলা। নিউজ টেবিলে যতক্ষণ সারওয়ার ভাই থাকতেন, আমি তাকে ভীষন ভয় পেতাম। আশঙ্কায় থাকতাম এই বুঝি উনি ডেকে সবার সামনে ধমকাবেন।

কিন্তু একান্তে সারওয়ার ভাই ছিলেন বন্ধুর মতন। আর আমি ব্যক্তিগতভাবে সৌভাগ্যবান, যে আমার সাথে তাঁর যে স্মৃতি, আমার বিশ্বাস সবার থেকেই বেশি। আর সারওয়ার ভাইর খুব কাছের বলে -অনেকেই ——- ।

২০০৫ সালে এপ্রিলে তাঁর সাথেই যুগান্তর ছেড়ে দৈনিক সমকালে আসা। কিন্তু তখনও সমকালের ডিক্লারেশন হয়নি। এটির দায়িত্ব বর্তায় আমার উপর। সমকালের ডিক্লারেশন,এক করুন ইতিহাস।

গোলাম সারওয়ার

পদে পদে বাধা। এরপর সব কিছু ঠিক করার পরও, থেমে যাওয়ার উপক্রম।

প্রকাশক দীর্ঘ আটটি মাস কাজ ছাড়াই বসিয়ে বসিয়ে সাংবাদিকদের বেতন দিয়েছেন। যুগান্তর থেকে আমরা যারা এক সঙ্গে ছেড়ে এসেছিলাম ( প্রায় ২০০ জন) তাদের মধ্যে তৈরি হয় চরম হতাশা। বিষয়টি সারওয়ার ভাই বুঝতে পারলেও কখনও মুখ ফুটে কারো কাছে কিছু বলতেন, হবে — হয়ে যাচ্ছে বলে সাহস যোগাতেন।

ডিক্লারেশনের কাজের জন্য আমাকে অধিকাংশ সময় থাকতে হতো বেলী রোড ও মালিবাগস্থ এসবি অফিস এবং আদালতের বারান্দায়।

ফলে সারওয়ার ভাইর সাথে দেখা হতো কম। তবে গভীর রাতে ফোনে কথা বলতেন,সর্বশেষ অবস্থাটা জেনে নিতেন। এছাড়াও কথা বলতেন মিজান ভাই ( মিজানুর রহমান খান, বর্তমানে প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক)।

ওই দিনগুলোতে সারওয়ার ভাইর কথায় বুঝতাম, তিনিও হতাশায় ভুগছেন। তবে কারো সাথে শেয়ার করেননি।

সমকালের ডিক্লারেশনের সমস্ত কাগজপত্র তৈরি হবার পরও আলোর মুখ দেখছিল না। এ অবস্থায় এসবির বিশেষ পুলিশ সুপার মাহবুব ভাই  (বর্তমানে ডিআইজি) আমাকে বললেন, ডিক্লারেশন পেতে ‘বিশেষ ভবনের আর্শীবাদ’ পেতে হবে। তা না হলে হবেনা। যতদূর মনে পড়ে ডিসেম্বরের (২০০৫) ২ অথবা ৩ তারিখ বলেছিলেন মাহবুব ভাই। এরপর সারওয়ার রুমে গিয়ে ( তখন সমকালের অফিস ছিল পান্থপথের ইউটিসি ভবনের ৮ তলায়) কথাটা জানিয়েছিলাম।

এরপর “ভবনের আর্শীবাদে’র পেছনে ছুটলেন সারওয়ার ভাই। শেষটায় অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আশার আলো দেখা গেল। আর ” ভবন আর্শীবাদ” মেলে বিকেলের দিকে।

দিনটি ২০০৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর। কনকনে শীতের রাতে ঢাকা জেলা প্রশাসক গায়ে শাল জড়িয়ে তার অফিসে এসে সমকালের ডিক্লারেশনের কাগজে স্বাক্ষর করেন।

ভাল খবরটি শোনার পর সারওয়ার ভাই, একটা কথাই বলেছিলেন, পিনাকি তোমার কষ্ট স্বার্থক হয়েছে।

সমকালের ডিক্লারেশন হলো।

কিন্তু অফিস জটিলতায় আরও কেটে যায় ৪ মাস। শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালের ৩১ মে দৈনিক সমকাল আত্মপ্রকাশ করে।
কিন্তু দূর্ভাগ্য। সমকাল বের হবার ৫ মাসের মধ্যেই সারওয়ার ভাইকে হাউসটি ছাড়তে হল। এরপর প্রায় তিন মাস ছিলেন আমেরিকায়। বেকার জীবন। প্রায়াই কথা হতো। প্রতিবারই বলতেন, আবার আমরা নতুন করে শুরু করবো।

কিন্তু দেশে ফেরার পর, কারো কারো বিশেষ অনুরোধে ফিরলেন দৈনিক যুগান্তরে। সিদ্ধান্তের কথা শোনার সারওয়ার ভাইর উত্তরার বাসায় গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করেছিলাম, যাতে যুগান্তরে না ফেরেন। পরে নানা ব্যাখ্যা দিয়ে আমাকে নিবৃত করেন।

২০০৬ সালের শেষ দিকে,তাঁর সঙ্গে ফিরলাম যুগান্তরে।আমিসহ ৫জন।

তবে পুরনো জায়গায়( যুগান্তর) ফিরলেও নিজের কাছে বড় অচেনা লাগছিল। অধিকাংশ রিপোর্টারই নতুন মুখ। পুরনো যারা ছিল তারাও খুব ভাল ভাবে আমাকে গ্রহণ করেনি। ওই সময় যিনি ছিলেন বার্তা সম্পাদক, তিনি একদিন চরম খারাপ ব্যবহার করলেন। শুধু সারওয়ার ভাইর কাছের লোক বলেই ( প্রয়াত সেই বার্তা সম্পাদককে ক্ষমা করার ইচ্ছা জাগলেও , মন আজও সায় দেয়না)।

এ কারণে যুগান্তরের চাকরিটা ছেড়ে দেব, এমনটা সিন্ধান্ত নিয়েছিলাম ওইদিন। এরজন্য মনে মনে ক্ষুব্দও হয়েছিলাম সারওয়ার ভাইর উপর।
তবে এনিয়ে নিজে থেকে কিছুই বলিনি। কিন্তু ঘটনাটা সারওয়ার ভাই কারো কাছ থেকে জেনে যান। বুঝতে পারেন আমার মনের অবস্থা।

একান্তে ডেকে শুধু বললেন, ‘আমি আছিনা।’

এরকিছুদিন পর ওই বার্তা সম্পাদককে সম্পাদকীয় বিভাগে বদলী করলেন।

তবে বছর না যেতেই ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময় সারওয়ার ভাইকে রেখে, তাঁরই সাবেক প্রতিষ্ঠান দৈনিক ইত্তেফাকে এলাম।-সেটাও ছিল সারওয়ার ভাইর ইচ্ছায়।

দ্বিতীয় দফায় যুগান্তর থেকে বিদায় নেয়ার সময়, সারওয়ার ভাই বলেছিলেন, আমার দোয়া সব সময় থাকবে তোমার জন্য । বললেন ‘ওখানে (ইত্তেফাকে) তদবির মুক্ত পরিবেশে’ কাজ করতে পারবে, তোমার কোন সমস্যা হবেনা।

ইত্তেফাকের আর,কে মিশন রোড অফিস থেকে কমলাপুর যুগান্তরের গেটে এসে মাঝে মাঝে তাঁরই গাড়িতে করে বাসায় ফিরতাম। ফেরার পথে যা কথা হোত তার পুরোটাই বন্ধুর মতো কথা ভাগাভাগি।

সেই সব কথার মধ্যে ছিল, নতুন একটি পত্রিকার স্বপ্ন ( নবযুগ) । যা হবে তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় দফায় যুগান্তরে ফেরাটা ভুল সিন্ধান্ত ছিল,সেটা বলেছিলেন। বলতে ভোলেনি আমার কথাই ঠিক ছিল।

শেষ পর্যন্ত ২০০৭ সালের শেষের দিকে সারওয়ার ভাই ছাড়লেন, যুগান্তর। এরপরই তিনি ভাবীকে নিয়ে চলে গেলেন আমেরিকায়। ফিরলেন প্রায় তিন মাস পর। ভাবীকে রেখে।

শুরু নতুন পত্রিকার প্রস্তুতি।সাপ্তাহিক ছুটির দিনটায় সারওয়ার ভাইর উত্তরার বাসায় কাটতো অনেকটা সময়।

দৈনিক নবযুগের ডিক্লারেশনটা ওই সময়টাতেই। সমকাল যেখানে লেগেছিল ৭ মাস, সেখানে নবযুগের জন্য লেগেছিল সব মিলিয়ে ১০ দিন। ইচ্ছা ছিল নিজেই বের করবেন। কিন্তু কারো কারো বিশেষ আগ্রহে তিনি একটি বড় শিল্প গোষ্ঠির সাথে চুক্তিবন্ধ হয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনমাস সম্পাদক হিসেবে বেতনও নিয়েছিলেন সারওয়ার ভাই।

তবে কয়েক মাস ডামি বের হয়েছিল। যার ডামি কপি কয়েক জায়গায় পৌঁছানোর দায়িত্বওটা ছিল আমার উপর।

কেন আলোর মুখ দেখেনি নবযুগ, সে নিয়ে তিনি বলেছেন, তার বেদনার কথা, কারা বিরোধিতা করেছে, তাদের কথা। যা তিনি কারো সাথে খুব একটা শেয়ার করেননি। আমাকেও নিষেধ করছিলেন বলতে।

যুগান্তর থেকে সমকাল, সমকাল থেকে যুগান্তর, যুগান্তর থেকে সমকাল। এ নিয়ে বলেছিলেন অনেক কথা। যা বললে হয়তো অনেকেই ক্ষুব্দ হবেন।
২০০৯ সালের মাঝমাঝি সময় , বলতে গেলে বেকার জীবন থেকে ফিরলেন দৈনিক সমকালে।

যোগদানের সিদান্ধ নেওয়ার আগেই আমাকে জানিয়েছিলেন, পিনাকি সমকালে ফিরছি, তোমাকে কিন্তু আসতে হবে, বলেছিলাম, ঠিক আছে দেখা যাবে।

সমকালে আরও তিন বছর কাটিয়ে ২০১২ সালে আবারও ফিরলাম ইত্তেফাকে। কিন্তু আগেই মতোই নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন সারওয়ার ভাই। বিদায় বেলা বলেছিলেন, ‘সমকাল তো তোমারই ঘর। আশাকরি আবার তোমাকে পাব।’

সারওয়ার ভাইর সাথে, সর্বশেষ কথা হয়েছিল, গত ৯ জুলাই রাতে। তিনি বলেছিলেন, শরীরটা খারাপ লাগছে বলে অফিস থেকে রাত ৮টার দিকে ফিরেছি। বলেছিলেন, তোমার সাথে কথা আছে। জানিয়েছিলাম, প্রেসক্লাবে দেখা করবো। কিন্তু কি কারণে ওই দিন আর প্রেস ক্লাবে যাওয়া হয়নি আমার।

মাস দুই আগে দৈনিক সমকালের প্রকাশক আজাদ ভাইর সাথে দেখা হয়েছিল। কোন এক প্রসঙ্গে তাকে বলেছিলাম, আপনার আর না হোক, আপনার একজন গোলাম সারওয়ার আছেন, এটাই তো যথেষ্ট।

সারওয়ার ভাইর খুব ইচ্ছা ছিল, দৈনিক নবযুগ হবে তার একান্তই নিজের প্রতিষ্ঠান। যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে। আমি বিশ্বাস করি, এটি একদিন আলোর মুখ দেখবেই।

সারওয়ার ভাই, আমাকে কতখানি বড় মাপের মানুষ, তা প্রতি মুহুর্তে আজ অনুভব করি।

তাঁর মৃত্যু সংবাদটা প্রথমে ফোন করে জানিয়েছিলেন,সমকালেরই মেশিং বিভাগের তৌহিদ ভাই। তখন রাত ১০টা। বলেছিলেন খবর শোনার পর প্রথমেই মনে পড়ল আপনার কথা,তাই। এইটাই মনে হয়, আমার বড় প্রাপ্তি।

আমার সারওয়ার ভাই নেই, ভাবতে চাইনা…………………..। তিনি আছেন, থাকবেন আমার সুঃখ, আনন্দ, কষ্ট ও বেদনার মাঝে। যতদিন বেঁচে থাকবো।

(সাংবাদিক পিনাকি দাসগুপ্তের ফেসবুক থেকে নেয়া।)

এই মুহুর্তে পড়া হচ্ছে

গুজবে কান দিয়ে রংপুরের যে যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেই শহিদুন্নবী জুয়েল আদতে ধর্মভিরু... আরও পড়ুন

আদতে ধর্মভিরু মুসলিম।

নভেম্বরের শুরুতেই নয়া প্রেসিডেন্ট পেতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডাকযোগে আগাম ভোট শুরু হয়েছে চলতি মাসে। এরই... আরও পড়ুন

ডাকযোগে আগাম ভোট

হাজী সেলিমপুত্র ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বহিস্কৃত কাউন্সিলর ইরফান সেলিম এবং তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ... আরও পড়ুন

মোহাম্মদ জাহিদের তিন

টানা দশ ঘণ্টা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে বসে আলোচনার পর আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির... আরও পড়ুন

যুদ্ধবিরতির বিষয়ে

হঠাৎ করে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায় সামাজিক মাধ্যমগুলোতে উদ্বিগ্ন আমজনতা। চলছে আন্দোলনও। দাবি উঠছে সর্বোচ্চ শাস্তি... আরও পড়ুন

ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ায়

প্রায় চার মাস বাদে পদ্মা সেতুর ৩২তম স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রায় ৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান... আরও পড়ুন

উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কাস পার্টির ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একটি নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন করেছে... আরও পড়ুন

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) উন্মোচন

সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের পাঠানো একটি বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ধ্বংস করেছে সৌদি এয়ার... আরও পড়ুন

বিস্ফোরক ভর্তি ড্রোন ধ্বংস

করোনা আক্রান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের আগে দেশটির ঐতিহ্য অনুযায়ী নির্বাচনী বিতর্ক... আরও পড়ুন

নির্বাচনী বিতর্ক

পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে চার শিশুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের... আরও পড়ুন

ধর্ষণের অভিযোগে চার শিশু

  সাম্প্রতিক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।